পুঁজিবাজারে টানা দরপতনে রক্তক্ষরণ, ৯ মাসে সূচক উধাও ৯৮৪ পয়েন্ট
শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ক্রমেই নাজুক হচ্ছে পুঁজিবাজার পরিস্থিতি। দিন যতই যাচ্ছে পতনের আকারও ততই বড় হচ্ছে। ফলে ভয়াবহ দরপতনের মধ্যে পড়েছে দেশের পুঁজিবাজার। ক্রেতা সংকটে প্রতিদিনই পুঁজিবাজারে দরপতন হচ্ছে। ফলে পুঁজি নিয়ে অজানা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।
এদিকে পুঁজিবাজারে টানা দরপতন হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিনিয়োগকারীরা। তাছাড়া পুঁজিবাজারে এই দরপতনের শেষ কোথায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে একের পর এক মিটিং করেও বাজারের জন্য কোন ইতিবাচক ফলাফল আনতে পারেনি রাশেদ মাকসুদ কমিশন।
ফলে রাশেদ মাকসুদ কমিশনের প্রতি দিন দিন বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এদিকে পুঁজিবাজারে টানা দরপতনের প্রতিবাদে সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে মতিঝিলে বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের অপসারণের দাবিতে কফিন মিছিল করেছেন বিনিয়োগকারীরা।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুঁজিবাজারে গত ৯ মাসের দরপতনে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। গত বছরের ৫ আগস্টের পর কার্যত অভিভাবকহীন ছিল বিএসইসি। এসময়ে ঊর্ধ্বমুখী ছিল পুঁজিবাজার। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার সূচক ডিএসইএক্স প্রায় ৮০০ পয়েন্ট বেড়ে ৬ হাজার পয়েন্ট ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
লেনদেনও বেড়ে ২ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছিল। কিন্তু গত বছরের ১৯ আগস্ট খন্দকার রাশেদ মাকসুদ যোগদানের পর থেকে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫৭৭৫ পয়েন্ট থেকে ৯৮৪ পয়েন্ট কমে ১৮ মে পর্যন্ত তা দাঁড়িয়েছে ৪৭৯১ পয়েন্টে। লেনদেন দুই হাজার কোটি টাকা থেকে নেমে আসে তিনশত কোটিতে।
এছাড়া পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের অনীহা, দুর্বল কোম্পানিগুলোর লেনদেন এবং অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তাই বর্তমান বাজারের স্বার্থে পুঁজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আস্থা ফিরিয়ে আনতে বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
একাধিক বিনিয়োগকারীর সাথে আলাপকালে বলেন, গত ১৭ বছরে আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে পুঁজিবাজারে লুট হলেও বিনিয়োগকারীরা ভাবছে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে পুঁজিবাজার ভাল হবে। এখন ভাল তো দুরের কথা গত ৯ মাসে পুঁজিবাজার থেকে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা উধাও হয়েছে। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে রাশেদ মাকসুদের পদত্যাগই এখন বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রথম শর্ত বলে বিনিয়োগকারীরা মনে করেন।
কারণ যেখানে সামান্য বিতর্কে মাশরুর রিয়াজ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিতে পিছিয়েছেন, সেখানে সর্বস্তরের বিনিয়োগকারী, বিশ্লেষক ও বিএসইসি কর্মকর্তাদের সমালোচনার পরও মাকসুদ এখনও পদ আঁকড়ে আছেন। এটি শুধু তার অযোগ্যতাই নয়, দায়িত্বশীলতার অভাবও প্রমাণ করে।
বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমআইএ) সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন বলেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান হিসেবে খন্দকার রাশেদ মাকসুদ যোগ দেওয়ার পর পুঁজিবাজারের ৯০ শতাংশ বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এ জন্য দ্রুত বিএসইসি চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত জরিপে বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের প্রতি অনাস্থা দাঁড়িয়েছে ৯৫ শতাংশের বেশি। তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেওয়ার পর বাজার মূলধন হারিয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার হাজার কোটি টাকা। মার্কেট সূচক হারিয়েছে প্রায় ১ হাজার পয়েন্ট।
এদিকে এক কার্যদিবস কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। এর আগে টানা তিন কার্যদিবস ঢালাও দরপতনের পর গত শনিবার পুঁজিবাজারে সূচকের কিছুটা উর্ধ্বমুখী দেখা মিলে। এদিন সূচকের সাথে কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর। তবে টাকার পরিমাণে লেনদেন কিছুটা বেড়েছে। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ২৯ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৪ হাজার ৭৯১ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৬ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৪৬ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ৮ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৭৮০ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯৫ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১০২ টির, দর কমেছে ২৪১ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৫৭ টির। ডিএসইতে ২৯২ কোটি ৬০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ২৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা বেশি। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ২৬২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৭৮ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪০৩ পয়েন্টে। সিএসইতে ২৩৬ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৮৮ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১১৮ টির এবং ৩০ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১০ কোটি ১ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।



