আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ৫ আগস্টের পর দেশের ব্যাংক খাতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে অনিয়ম ও কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ধারাবাহিকতায় বেশ কয়েকটি ব্যাংকের এমডি ও চেয়ারম্যানের পদ পরিবর্তন হয়েছে। তবে অনিয়মের অভিযোগ থাকার পরও বহাল তবিয়তে রয়েছেন যমুনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মির্জা ইলিয়াছ উদ্দিন আহমেদ।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এরই মধ্যে ব্যাংকের কেনাকাটায় অনিয়মের বিষয়ে যমুনা ব্যাংকের এমডির সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে। এসব অনিয়ম ঘটেছে গত সরকারের আমলের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলামের ছেলে ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সাইদুল ইসলামের যোগসাজশে। যিনি এখন বিদেশে পলাতক বলে জানা গেছে। তার দায়িত্বে থাকাকালে ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে।

তবে হঠাৎ করে যমুনা ব্যাংকের এমডি মির্জা ইলিয়াস উদ্দীন আহম্মদকে নিয়ে আবারও তদন্ত শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মির্জা ইলিয়াসের অনিয়মের অভিযোগ ধামাচাপা পড়ে ছিল। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) মির্জা ইলিয়াসের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে সবগুলো ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়েছে। গত বুধবার ব্যাংকগুলোতে সেই চিঠি পৌঁছেছে বলে সূত্র জানায়।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, তাজুল ইসলামের ছেলে ও যমুনা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সাইদুল ইসলাম ২০২৩ সালের আগস্টে এক বোর্ড সভায় প্রভাব খাটিয়ে ১৫ কোটি টাকার আইটির হার্ডওয়্যার ও অন্য সরঞ্জামাদি প্রায় ৯০ কোটি টাকায় ক্রয় দেখান। তিনি বাবার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি করে দেশে-বিদেশে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বলে জানা গেছে। অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে ওই সভায় আইটিসামগ্রী কেনার বিষয়টি পাস করানোর সঙ্গে ব্যাংকের অন্য দুই পরিচালক এবং আইটি বিভাগের প্রধান জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দিন দিন বাড়ছে, কমছে প্রভিশন, আর দুর্বল হয়ে পড়ছে মূলধন কাঠামো। কাগজে-কলমে বেশিরভাগ ব্যাংকই নিজেকে লাভজনক দেখাচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তাদের মুনাফার বড় অংশই ‘সংখ্যার খেলা’। খেলাপি ঋণ লুকিয়ে, প্রভিশন কমিয়ে আর ট্রেজারি ইনকাম বাড়িয়ে তারা এমন এক আর্থিক মরীচিকা তৈরি করছে যা বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করছে এবং পুঁজিবাজারকে অস্থির করছে। সর্বশেষ জুন মাসের শেষে এ খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ২৭.০৯ শতাংশ।

অর্থ্যাৎ ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় চার ভাগের এক ভাগের বেশিই ইতিমধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে। এটি দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কিন্তু এই সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি এক ভাঙ্গা বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। ব্যাংকগুলো এখন নিয়মিত মুনাফা ঘোষণা করছে, ডিভিডেন্ড দিচ্ছে, কিন্তু সেই মুনাফার ভিত্তি দুর্বল।

কারণ তারা আইএফআরএসআইএস মানদণ্ড উপেক্ষা করে প্রকৃত লোকসান লুকিয়ে রাখছে, যাতে কাগজে মুনাফা বেশি দেখানো যায়, শেয়ারদর ধরে রাখা যায় এবং পরিচালনা পর্ষদের বোনাস অক্ষুণ্ন থাকে। অন্যদিকে অনেক ব্যাংকই খেলাপি ঋণকে ‘পলিশ’ করে কাগজে ভালো দেখানোর চেষ্টা করছে। তারা ঋণ পুনঃতফসিল করছে, আবার কিছু ঋণ ‘খারিজ’ করে দিচ্ছে, ফলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র জনগণের চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা যায়, অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের ব্যাংক খাতের নেতৃত্বে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটলেও যমুনা ব্যাংক ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। গাজী গ্রুপের কর্ণধার বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীরের ছেলে তৎকালীন যমুনা ব্যাংক চেয়ারম্যান গাজী গোলাম আশরিয়া নিজে থেকে ব্যাংকের নেতৃত্ব তুলে দেন রবিনটেক্সের রবিন রাজন সাখাওয়াতের হাতে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত পর্ষদ সভায় রবিন রাজন যমুনা ব্যাংকের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। যদিও এর ঠিক এক বছরের মাথায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয় মো. বেলাল হোসেনকে। ফলে ব্যাংকের নেতৃত্বে সরাসরি আওয়ামী ঘনিষ্ঠ কেউ না থাকায় অতীতে ব্যাংকে সংঘটিত অনিয়ম আড়ালে চলে যায়। বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ মাথায় নিয়েও বহাল থাকেন বেসরকারি খাতের যমুনা ব্যাংকের এমডি মির্জা ইলিয়াস উদ্দীন আহম্মদ। অথচ তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই অভিযোগ উঠেছিল। এসব অভিযোগের মধ্যে ছিল ব্যাংকের কেনাকাটা সংক্রান্ত অনিয়ম, নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার কমতি থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন গভর্নর ফজলে কবিরকে ‘ম্যানেজ’ করে এমডি পদের মেয়াদ নবায়ন করা।

জানা গেছে, ব্যাংকটির কেনাকাটা সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে কাজ শুরু করে দুদক। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলামের ছেলে মো. সাইদুল ইসলাম যখন যমুনা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন, তখন ওই অনিয়ম সংঘটিত হয়।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, সাইদুল ইসলাম ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে এক পর্ষদ সভায় প্রভাব খাটিয়ে ১৫ কোটি টাকার আইটির হার্ডওয়্যার ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি প্রায় ৯০ কোটি টাকায় ক্রয় দেখিয়ে সেই টাকা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের বিভিন্ন খাতে শতকোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করেছে তৎকালীন বোর্ড। সাইদুল ইসলাম বর্তমানে বিদেশে পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে।

অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে ওই সভায় আইটি সামগ্রী ক্রয়ের অনুমোদন করানোর সঙ্গে ব্যাংকের দুই পরিচালক এবং একজন আইটি বিভাগের কর্মকর্তার নামও জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ধারণা করা হয়, চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের সুনজরে থাকায় ব্যাংকের এমডি বারবার পুনর্নিয়োগ পেয়েছেন।

আইটি সামগ্রী কেনার অভিযোগের ব্যাপারে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম-পরিচালক স্বাক্ষরিত চিঠি দুর্নীতি দমন কমিশনে গেলে বিষয়টি আলোচনায় আসে। এই চিঠির আলোকে দুদকের মহাপরিচালককে (মানি লন্ডারিং) কমিশনের ব্যাংকিং শাখা হতে অনুসন্ধান-পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা তৃতীয় শ্রেণি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনো ব্যাংকের এমডি হতে পারবেন না। কিন্তু যমুনা ব্যাংকের বর্তমান এমডি মির্জা ইলিয়াস উদ্দীন আহম্মদ শিক্ষাজীবনে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণিপ্রাপ্ত। এরপরও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে তাকে আরও পাঁচ বছরের জন্য এমডি হিসেবে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়।

জানা যায়, মির্জা ইলিয়াস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৮৫ সালে ন্যাশনাল ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর তিনি প্রাইম ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ২০০১ সালে যমুনা ব্যাংকে এসএভিপি হিসেবে যোগ দেন এবং ২০১৩ সালে একই ব্যাংকে ডিএমডি এবং ২০১৬ সালে এএমডি হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।

২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর ব্যাংকটির এমডি ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মির্জা ইলিয়াস। ২০১৯ সালে যখন তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়, সেই সময়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম না মেনেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কারণ ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের এমডি নিয়োগসংক্রান্ত এক সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়েই তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি গ্রহণযোগ্য হবে না। পরবর্তীতে এমডি নিয়োগের নতুন নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই নীতিমালায়ও ওই ধারা বলবৎ রাখা হয়।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালের ১৯ অক্টোবর মির্জা ইলিয়াস উদ্দীন আহম্মদের প্রথম দফার এমডি নিয়োগের মেয়াদ শেষ হয়। দ্বিতীয় দফায় নিয়োগের জন্য গত ২০২২ সালের ১৯ এপ্রিল মির্জা ইলিয়াসের নাম সুপারিশ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন চাওয়া হয়। পরে তাকে পাঁচ বছরের জন্য এমডি হিসেবে পুনর্নিয়োগের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সময়ে গভর্নর ছিলেন ফজলে কবির।

জানা গেছে, যমুনা ব্যাংকে চাকরি করতেন ফজলে কবিরের ভাই ফজলে কাইয়ুম। তাকে দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক করতে সহায়তা করেন এমডি মির্জা ইলিয়াস। এর ফলে ফজলে কবির এমডিকে পাঁচ বছরের জন্য পুননিয়োগের অনুমোদন দেন। তবে পরবর্তী সময়ে গভর্নর পরিবর্তন হয়, আব্দুর রউফ তালুকদার দায়িত্বে আসেন। ওই সময়ে যমুনা ব্যাংকের এমডির ব্যাংক হিসাবে লেনদেনের তথ্যে অস্বাভাবিক চিত্র ধরা পড়ে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন সেসব তথ্য তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয়, যমুনা ব্যাংকের এমডির বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য ব্যাংকটির দিলকুশা শাখায় একটি হিসাব পরিচালিত হয়। এতে ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধার অর্থ হিসাবটিতে জমা হওয়ার পাশাপাশি নগদ এবং অন্য ব্যাংক থেকে অনলাইন ট্রান্সফারের মাধ্যমে প্রায় ৬৭ লাখ ৫৮ হাজার টাকা জমা হয়েছে। এ অর্থের কোনো উৎস খুঁজে পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আহসান এইচ মনসুর গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়ার পর ১০-১১টি ব্যাংক নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা দেখা যায়। তবে সেসময় যমুনা ব্যাংক নিয়ে তৎকালীন গভর্নরের কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি আহসান মনসুরের স্থলাভিষিক্ত হন মো. মোস্তাকুর রহমান। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই তলব করা হয় মির্জা ইলিয়াসের ব্যাংক হিসাবের তথ্য।

চিঠিতে মির্জা ইলিয়াসের পিতা-মাতার নাম, জন্ম তারিখ ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে তার নামে থাকা ব্যাংক হিসাব, ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড, লকারসহ হিসাব খোলার ফরমের তথ্যসহ যাবতীয় তথ্য তিন কর্মদিবসের মধ্যে বিএফআইইউকে পাঠাতে বলা হয়। এ বিষয়ে কথা বলতে মির্জা ইলিয়াস উদ্দীন আহম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কল রিসিভ করেননি।