স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত টেলিযোগাযোগ খাতের বহুজাতিক কোম্পানি রবি আজিয়াটা পিএলসির এর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন এবং করপোরেট সুশাসনে ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্তে নেমেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিএসইসি। কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, কমিটিকে আগামী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ থেকে সম্প্রতি জারি করা এক বিশেষ আদেশে তদন্তের পরিধি ও শর্তাবলি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, কোম্পানিটির সাম্প্রতিক আর্থিক কার্যক্রম, তথ্য প্রকাশের যথার্থতা এবং বিদ্যমান আইন ও বিধি পরিপালনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিএসইসির উপপরিচালক মো. রফিকুন্নবী, সহকারী পরিচালক তন্ময় কুমার ঘোষ এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এর ব্যবস্থাপক গিয়াস উদ্দিন।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতেই রবির বিরুদ্ধে এই তদন্ত শুরু হয়েছে। বিশেষ করে কোম্পানিটির বিগত কয়েক বছরের আর্থিক লেনদেন, তথ্য গোপনের সম্ভাবনা এবং আইন ও বিধির কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না তা নিবিড়ভাবে যাচাই করবে তদন্ত কমিটি। কমিটির কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে ২০২১ ও ২০২২ অর্থবছরের ৩০ জুন পর্যন্ত নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করা। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএসইসি।

তদন্তে আরও দেখা হবে, ওই সময়ের আর্থিক বিবরণীতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা হয়েছে কি না। পাশাপাশি অ-পরিচালন আয়-ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেনে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে কি না, তাও যাচাই করা হবে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয়কে মূলধনী ব্যয় হিসেবে দেখিয়ে মুনাফা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। বিষয়টি তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) এবং অডিট কমিটির কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হবে। রবি ও ইডটকো বাংলাদেশের মধ্যে লিজ চুক্তি, অবকাঠামো ভাগাভাগি এবং শেয়ার হস্তান্তরের মতো স্পর্শকাতর লেনদেনগুলোর বিস্তারিত তথ্যও সংগ্রহ করবে তদন্ত দল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রবি আজিয়াটা পিএলসির মুনাফা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। কোম্পানিটির সেলস বা বিক্রয় কমলেও মুনাফা বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। ফলে পুঁজিবাজারে অনেক কোম্পানি রয়েছে যারা শেয়ার ম্যানুপুলেট করাসহ নানা অনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য মুনাফা বেশি দেখায়। মুনাফা বেশি দেখিয়ে শেয়ার কারসাজি চক্রের সাথে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ হাত মিলিয়ে শেয়ার দর বৃদ্ধি করে। আর সেই উচ্চ দামের শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয় চক্রটি এবং মার্কেট থেকে চলে যায় তারা। আর এই অনৈতিক কাজের সাথে কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা থাকে।

এবার রবি আজিয়াটার বিরুদ্ধে এমনই অভিযোগ করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বাজার সংশ্লিষ্টরা। তারা অভিযোগ করে বলেন, রবি আজিয়াটা গত বছরে (৩১ ডিসেম্বর ২০২৪) মুনাফা বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যে রিসিভেবল বেশি দেখিয়েছে। রিসিভেবল হচ্ছে- গ্রাহকদের কাছে কোম্পানির পাওনা টাকা। এছাড়াও বিক্রয় ও বিতরণ খরচ মাত্রাতিরিক্ত কম দেখিয়েছে, যার ফলে পাঁচ বছরের (২০২০-২০২৪) মধ্যে গত বছর সর্বোচ্চ মুনাফা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। ফলে মুনাফা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার দরে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর রবি আজিয়াটার অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড আদার রিসিভেবল ছিল ৮৩১ কোটি ৯ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। এর আগের বছর যা ছিল ৭৭৮ কোটি ১৪ লাখ ২০ হাজার টাকা। বছরের ব্যবধানে অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড আদার রিসিভেবল বেড়েছে ৫২ কোটি ৯৫ লাখ ১৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ গ্রাহকদের কাছে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে ৫২ কোটি টাকার বেশি পাওনা রয়েছে। এই টাকা কখন উঠবে, আদৌ উঠবে কিনা সে ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু কোম্পানিটির মুনাফায় ঠিকই এই টাকা যোগ হয়েছে এবং গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৪ সালে কোম্পানির মুনাফা সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে গেছে।

কোম্পানি সূত্রে আরও জানা গেছে, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ হিসাব বছরে রবি আজিয়াটার বিক্রয় রাজস্ব এসে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৯২২ কোটি ৭৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা। আর এর আগের বছর যা ছিল ৯ হাজার ৯২৯ কোটি ৩৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা। এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় রাজস্ব কমেছে ৬ কোটি ৫৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকা বা দশমিক ০৬ শতাংশ।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২৩ সালে কোম্পানির বিক্রয় ও বিতরণ খরচ হয়েছে এক হাজার ৪০৭ কোটি ২৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা। আর গত বছর তা এসে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ২৯৩ কোটি ৬ লাখ ৫ হাজার টাকা। বছরের ব্যবধানে বিক্রয় ও বিতরণ খরচ কমেছে ১১৪ কোটি ২২ লাখ ২৩ হাজার টাকা।

এদিকে বিক্রয় রাজস্ব দশমিক ০৬ শতাংশ কমলেও বিক্রয় ও বিতরণ খরচ কমেছে অস্বাভাবিক অর্থাৎ ৮ শতাংশ। আর টাকার অঙ্কে কোম্পানিটির বিক্রয় রাজস্ব কমেছে ৬ কোটি ৫৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। কিন্তু বিক্রয় ও বিতরণ খরচ কমেছে ১১৪ কোটি ২২ লাখ ২৩ হাজার টাকা, যা অস্বাভিক বলছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

বিএসইসি জানায়, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯ এবং ১৯৯৩ সালের বিএসইসি আইনের বিশেষ ক্ষমতাবলে এই তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০২০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া রবি আজিয়াটার পরিশোধিত মূলধন ৫ হাজার ২৩৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।

সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তথ্যানুযায়ী, কোম্পানিটির প্রায় ৯০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে। বাকি শেয়ারের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৭.১৪ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২.৮৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, আর্থিক অনিয়ম ও আইন লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে কমিশন আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেবে।