স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: আওয়ামী লীগের টানা ১৬ বছরের শাসনামলে পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বাজারের বড় অংশীজনরা নতুন করে আশার আলো দেখতে শুরু করেন। তাদের প্রত্যাশা ছিল, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পুঁজিবাজারকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তবে বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। যাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো তিনি আগের থেকেও মাফিয়া বনে গেলেন।

বাজার সংশ্লিষ্ঠদের মতে, ৫ আগস্টের পর পুঁজিবাজারকে মানুষের আস্থায় পরিণত করতে দায়িত্ব দেওয়া হয় একজন ব্যাংকার খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে। যিনি ব্যাংকিং খাতেও অথর্ব বা নিষ্প্রভ ব্যাংকার হিসেবে পরিচিত ছিল। নিজ ইচ্ছেমাফিক নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপাকে ফেলতে শুরু করেন। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে পুঁজিবাজার খাদের কিনারে চলে যায়। সরকারের ঘোষিত সংস্কার পদক্ষেপগুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে পড়ে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে পুঁজিবাজার আরও নিম্নগামী হয়, যার চরম মূল্য দিতে হয় বিনিয়োগকারী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে।

ফলে দীর্ঘদিন পর দেশের মানুষ ভোটের অধিকার ফিরে পায়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের ভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজার-সংশ্লিষ্টরা আবারও আশাবাদী হয়ে উঠছেন। অবশ্য এর কারণও রয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি যখন ক্ষমতায় থাকে তখন পুঁজিবাজার ভালো অবস্থানে থাকে। আর তাই এখন সব মহল থেকেই দাবি উঠছে বাজার সংস্কারের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার জরুরি।

যার ফলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান পদ থেকে খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে এরইমধ্যে আইনে সংশোধন এনেছে সরকার। চলতি সপ্তাহেই আইনের সংশোধনীর গেজেট প্রকাশ করার পাশাপাশি বিএসইসিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে এক ডজন ব্যক্তির নাম জমা পড়েছে। তবে দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন দুজন। এর মধ্যে একজনের অতীতে বিএসইসিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আরেকজনের রয়েছে একাধিক বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিএসইসি থেকে খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে সরিয়ে চলতি সপ্তাহেই নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। তবে নতুন চেয়ারম্যান কে হচ্ছেন তা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ওপর নির্ভর করছে। সরকার একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিকে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিতে চায়। সে লক্ষ্যেই কার্যক্রম চলছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান একজন বয়স্ক ব্যক্তি হবেন, এটা নিশ্চিত। তিনি কে, তা চলতি সপ্তাহেই জানা যাবে। সরকার অনেক চিন্তাভাবনা করেই তাকে নিয়োগ দিচ্ছেন। সরকার চায় পুঁজিবাজারে গতি আসুক এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ুক। পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করারও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সবদিক বিবেচনা করে সরকার যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকেই চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা বলেন, বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে এক ডজনের বেশি নামের তালিকা অর্থ মন্ত্রণালয়ে এসেছে। তবে কে বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হবেন, সেটি এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। চলতি সপ্তাহেই এটি চূড়ান্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার চাচ্ছে দ্রুত বিএসইসিতে পরিবর্তন আনতে। বিএসইসিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি আইডিআরএতেও নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হবে।

এ লক্ষ্যে দ্রুত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন এবং বিমা আইনে সংশোধন আনা হয়েছে। দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থায় অভিজ্ঞ ও দক্ষ চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ বয়সের সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে যে কোনো বয়সী ব্যক্তিকে এখন বিএসইসি ও আইডিআরএর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে।

এতদিন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩ অনুযায়ী বিএসইসির চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়স সীমা নির্ধারণ করা ছিল ৬৫ বছর। অর্থাৎ, ৬৫ বছর পূর্ণ হলে কোনো ব্যক্তি বিএসইসির চেয়ারম্যান হওয়ার বা পদে থাকার যোগ্যতা হারাতেন। অন্যদিকে, আইডিআরএর চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়স সীমা নির্ধারণ করা ছিল ৬৭ বছর। গত ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়সের সীমা তুলে দিয়ে আইনের সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর দ্রুত ভেটিং সম্পন্ন করে গত গত বৃহস্পতিবার সংসদের আইনের সংশোধনী বিল আকারে পাস হয়। এখন এটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।

সূত্র জানিয়েছে, এই সংশোধনী আনতে বিভিন্ন দেশের আইন পর্যালোচনা করা হয়। তাতে দেখা গেছে, অনেক দেশেই পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়স সীমা নির্ধারণ করা নেই। তবে ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ডসহ কযেকটি দেশে সর্বোচ্চ বয়স সীমা নির্ধারণ করা আছে। এক্ষেত্রে ভারতে সর্বোচ্চ ৬২ বছর, পাকিস্তানে ৬৫ বছর এবং থাইল্যান্ডে ৭০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এক সদস্য বলেন, পুঁজিবাজারে গতি বাড়াতে দ্রুত বিএসইসির চেয়ারম্যান পরিবর্তন করা উচিত। বর্তমান চেয়ারম্যানের ওপর থেকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। বিএসইসির চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়সী তুলে দিতে আইন যে দ্রুত সংশোধন করা হয়েছে, তাতে আমরা আশা করছি খুব দ্রুতই বর্তমান চেয়ারম্যানকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা থাকবে একজন সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিকেই সরকার বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান করবেন। যিনি সার্বিক পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। সেই সঙ্গে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে বিএসইসির নতুন নেতৃত্ব দ্রুত বাজারে কিছু ভালো কোম্পানির আইপিও আনবেন এবং দুর্বল কোনো কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেবেন না। দ্রুত কয়েকটি ভালো কোম্পানি আনতে পারলে বাজারে গতি ফিরে আসবে।

ডিএসই সূত্রে জানা যায়, রাশেদ মাকসুদ কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার দিন অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৭৭৮ পয়েন্টে অবস্থান করছিল। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে ডিএসইর সূচক দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৮৬ পয়েন্টে। অর্থাৎ গত ২০ মাসে খন্দকার রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ডিএসইএক্স সূচক কমেছে ৪৯২ পয়েন্ট, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট বাড়াচ্ছে।
এই সময়ের মধ্যে একটা ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি

। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে বড় ধরণের সংস্কারের আশা করেছিলেন। কিন্তু সূচক ও লেনদেনের গতিপ্রকৃতি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে কমিশন নতুন বিধিমালা প্রণয়ন, সংস্কার টাস্কফোর্স ও তদন্ত কমিটি গঠনসহ পুঁজিবাজার সংস্কারে বেশ কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনলেও বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় করতে প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি।

কমিশনের ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার অভাব এবং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। মাকসুদ কমিশন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কার্যকর এবং কার্যকরী করার জন্য বিএসইসির সকল কর্মীদের একত্রিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রায় সকল কর্মকর্তার উপর অবিশ্বাস করেছেন, যার ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে।

বিএসইসির একজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাশেদ মাকসুদ কমিশন জরিমানা আরোপ এবং সংস্কারের উপর বেশি জোর দিয়েছিল, যদিও তার মেয়াদে বাজারে কোনো আইপিও অনুমোদন হয়নি। একজন নির্বাহী পরিচালককে বরখাস্ত করার পর বিএসইসির কর্মকর্তাদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন মাকসুদ কমিশন।

এ ব্যাপারে বিএনবি সিকিউরিটিজ হাউজের বিনিয়োগকারী আব্দুল বারী বলেন, বর্তমান কমিশন দ্বায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারে বিনিয়োগ নয় সংস্কার নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার কারণে বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করেছে এতে করে অনেক বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়ে চলে গেছেন। ৫টি ব্যাংক মার্জার হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ব্যাপক ক্ষতিরমুখে পড়েছেন। এক্ষেত্রে পুঁজির নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে কমিশন।

গত ২০ মাসে বাজারে তারল্য না বাড়ায় বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়েছে বলে মনে করেন বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পরিষদের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম। তিনি বলেন, প্রায় দুই বছরে একটা ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানি পুঁজিবাজারে না আসা বা আনার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান না হওয়া হতাশাজনক।

কারণ বিগত ১৫ বছরে দুয়েকটি ভালো স্টক ছাড়া সব দুর্বল কোম্পানি পুঁজিবাজারে আনা হয়েছিল। তাই বর্তমান কমিশনের কাছে বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা ছিল তারা ভালো কোম্পানি বাজারে আনবে। তবে কমিশন নিজেই অভ্যান্তরীণ সমস্যায় জড়িয়ে পড়ায় বাজারে কাঙ্খিত ফলাফল আসেনি।