দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: সপ্তাহজুড়ে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এনসিসি ব্যাংক পিএলসি। মাত্র চার কার্যদিবসের লেনদেনেই ব্যাংকটির শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ ১১১ কোটি টাকার বেশি ছাড়িয়েছে। এর ফলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সপ্তাহজুড়ে লেনদেনের তালিকায় শীর্ষ অবস্থান দখল করেছে ব্যাংকটি।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক আর্থিক ফলাফলে মুনাফা বৃদ্ধি, আকর্ষণীয় লভ্যাংশ ঘোষণা এবং স্থিতিশীল আর্থিক ভিত্তি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। ফলে সপ্তাহজুড়ে শেয়ারটিতে উল্লেখযোগ্য লেনদেন দেখা যায়।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের চার কার্যদিবসে এনসিসি ব্যাংকের মোট শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১১১ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার টাকার। পুরো সপ্তাহে ডিএসইতে হওয়া মোট লেনদেনের ২ দশমিক ১৬ শতাংশই ছিল এই একক কোম্পানির দখলে। সপ্তাহ শেষে শেয়ারটির সমাপনী মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৬ টাকা ৩০ পয়সায়।

বাজার বিশ্লেষকদের ভাষ্য, কোনো কোম্পানির শেয়ার যখন ধারাবাহিকভাবে লেনদেনের শীর্ষে অবস্থান করে, তখন সেটি সাধারণত বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহ ও আস্থার ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষ করে ব্যাংক খাতের শেয়ারগুলোর মধ্যে এনসিসি ব্যাংকের সাম্প্রতিক আর্থিক উন্নতি বিনিয়োগকারীদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে।
চলতি ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যাংকটির মুনাফা বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে।

জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে শেয়ারপ্রতি সমন্বিত আয় হয়েছে ১ টাকা ১১ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৯৪ পয়সা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি সমন্বিত নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ২৮ টাকা ৪১ পয়সা। বর্তমান বাজারদরের তুলনায় সম্পদমূল্যের এই ব্যবধান অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে শেয়ারটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ২০২৫ হিসাব বছরের জন্য ২১ শতাংশ লভ্যাংশ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে ১৭ শতাংশ নগদ এবং ৪ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি ব্যাংকটির অন্যতম উচ্চ লভ্যাংশ প্রস্তাব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২৫ হিসাব বছরে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি সমন্বিত আয় দাঁড়িয়েছে ৪ টাকা ২৯ পয়সা, যা আগের বছরের ৩ টাকা ৯৪ পয়সার তুলনায় বেশি।

একই সময়ে শেয়ারপ্রতি সমন্বিত নিট সম্পদমূল্য বেড়ে ২৭ টাকা ২০ পয়সায় পৌঁছেছে। মুনাফা ও সম্পদমূল্যের এই ধারাবাহিক উন্নতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে বলে বাজার পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।

গত কয়েক বছরের আর্থিক ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এনসিসি ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে লভ্যাংশ দিয়ে আসছে। ২০২৪ হিসাব বছরে ব্যাংকটি ১৩ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ বিতরণ করে। ওই বছরে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ২ টাকা ১০ পয়সা। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ২ টাকা ৭ পয়সা এবং বিনিয়োগকারীরা পেয়েছিলেন ১২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ। আরও আগে ২০২২ হিসাব বছরে ব্যাংকটি ৫ শতাংশ নগদ ও ৫ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ দিয়েছিল। ওই সময় শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ২ টাকা ৩৮ পয়সা।

ফলে দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক বছরে ব্যাংকটির আয় ও সম্পদমূল্য ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এনসিসি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো এর ঋণমান। সর্বশেষ মূল্যায়নে ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি ক্রেডিট রেটিং নির্ধারণ করা হয়েছে ‘এএ প্লাস’ এবং স্বল্পমেয়াদি রেটিং ‘এসটি-১’। এই রেটিং ইঙ্গিত দেয় যে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এবং আর্থিক ভিত্তি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

ব্যাংকটির করপোরেট কাঠামোর দিক থেকেও উল্লেখযোগ্য অবস্থান রয়েছে। ২০০০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এনসিসি ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১ হাজার ১৫৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ব্যাংকটির রিজার্ভে রয়েছে ১ হাজার ৩৭৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা।

মোট শেয়ারের মধ্যে ৪২ দশমিক ১০ শতাংশ উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ২৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ শেয়ার। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মালিকানায় রয়েছে দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৩৩ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার।