দেশ প্রতিক্ষণ, চট্টগ্রাম: বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে স্বাভাবিক এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনে। এতে দৈনিক আড়াই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি)। দেশের চাহিদা মেটাতে সরকার বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে তরল জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দিকে ঝুঁকছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বাড়তি চাহিদা জোগান দিতে পূর্বপরিকল্পনার অতিরিক্ত ফার্নেস অয়েল আমদানি করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

পিডিবি ও বিপিসি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে (আইপিপি) পুরোনো পাওনা পরিশোধের জন্য ছয় হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। এতে নিজস্ব উদ্যোগে ফার্নেস অয়েল আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। পিডিবির চাহিদা অনুযায়ী বিপিসি ৩৫ দিনে ফার্নেস অয়েলের সাতটি পার্সেল আমদানি করছে।

তরল জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইপিপিগুলো আমদানি করে নিজেরা। অনেকে পিডিবির মাধ্যমে বিপিসি থেকে তেল নিয়ে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখে। বিপিসি আমদানির মাধ্যমে চাহিদামাফিক পিডিবিকে তরল জ্বালানি সরবরাহ করে। তবে বিগত বছরগুলোতে চাহিদা দিয়েও পিডিবি ফার্নেস অয়েল না নেওয়ায় বিপাকে পড়তে হয় বিপিসিকে।

২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পিডিবি এক চিঠিতে ২০২৬ সালের জন্য মাসওয়ারি ফার্নেস অয়েলের চাহিদা দিয়ে চিঠি দেয় বিপিসিকে। ওই চিঠিতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য আট লাখ ২৬ হাজার ২শ টন ফার্নেস অয়েলের চাহিদা দেওয়া হয়। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসের জন্য চাহিদা রয়েছে ৮৮ হাজার ২৯৮ টনের।

কিন্তু চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পিডিবির সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আফরোজা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সেপ্টেম্বর মাসের জন্য দুই লাখ চার হাজার টনের ফার্নেস অয়েলের সংশোধিত চাহিদা দেয়। এতে সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে ফার্নেস অয়েলের সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে বিপিসি।

এর আগে গত ২১ আগস্ট বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে ফার্নেস অয়েলনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে দৈনিক গড়ে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি তেল সরবরাহ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

পিডিবির ৭-৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আগের তিনদিনে রাত ৯টায় পিক আওয়ারে ১৭শ ৭১ থেকে ২৫শ ৬১ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। এর মধ্যে ৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন বলছে, ৮ সেপ্টেম্বর পিক আওয়ার রাত ৯টায় ডিমান্ড ছিল ১৭ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। ওই সময়ে পিডিবির ৯ জোনে লোডশেডিং হয়েছে ১৭৭১ মেগাওয়াট।

এর মধ্যে ঢাকা জোনে সর্বোচ্চ ৪৪৭ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহ জোনে ৩৭৬ মেগাওয়াট, খুলনা জোনে ৩০৭ মেগাওয়াট, কুমিল্লা জোনে ২৯০ মেগাওয়াট, সিলেট জোনে ১৪২ মেগাওয়াট, রাজশাহী জোনে ১১৮ মেগাওয়াট, রংপুরে ৭৬ মেগাওয়াট, বরিশালে ১২ মেগাওয়াট এবং চট্টগ্রামে সর্বনিম্ন ৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।

৮ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন বলছে, আগের দিন ৭ সেপ্টেম্বর সারাদেশে দুই হাজার ৫৬১ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। ওইদিন ঢাকায় লোডশেডিং হয় সর্বোচ্চ ৬৯৬ মেগাওয়াট। ৬ সেপ্টেম্বর সারাদেশে ২১শ ১০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের কথা বলেছে পিডিবি। এর মধ্যে ঢাকায় সর্বোচ্চ ৮১৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়।

৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ সেপ্টেম্বর পিডিবির গ্রিড লাইনে সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে ৩৫২ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন কিলোওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ কয়লা থেকে ১২৩ দশমিক শূন্য ৩ মিলিয়ন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়।

পাশাপাশি গ্যাসে ১১৫ দশমিক ৮১ মিলিয়ন কিলোওয়াট, আমদানি থেকে ৫৩ দশমিক শূন্য ৪ মিলিয়ন কিলোওয়াট, ফার্নেস অয়েলে ৪৫ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন কিলোওয়াট, ডিজেল থেকে ৫ দশমিক ৭২ মিলিয়ন কিলোওয়াট, পানি থেকে ৫ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন কিলোওয়াট, সোলার থেকে ৩ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন কিলোওয়াট এবং বায়ু থেকে দশমিক ১১ মিলিয়ন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়।

৮ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭ সেপ্টেম্বর পিডিবির গ্রিড লাইনে সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে ৩৪৫ দশমিক ৪৭ মিলিয়ন কিলোওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ গ্যাস থেকে ১১৯ দশমিক ২৮ মিলিয়ন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়।

পাশাপাশি কয়লায় ১১৫ দশমিক ১৯ মিলিয়ন কিলোওয়াট, আমদানি থেকে ৫২ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন কিলোওয়াট, ফার্নেস অয়েলে ৪২ দশমিক ১৮ মিলিয়ন কিলোওয়াট, ডিজেল থেকে ৬ দশমিক ৪৭ মিলিয়ন কিলোওয়াট, পানি থেকে ৫ দশমিক ৩১ মিলিয়ন কিলোওয়াট, সোলার থেকে ৪ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন কিলোওয়াট এবং বায়ু থেকে দশমিক শূন্য ৭ মিলিয়ন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়।

পেট্রোবাংলার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ এক-তৃতীয়াংশে নেমেছে। দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ গ্যাসনির্ভর। এর মধ্যে সারাদেশে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা রয়েছে দুই হাজার ৫২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু তথ্য বলছে, পেট্রোবাংলার ছয় বিতরণ প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গত ৮ সেপ্টেম্বর ৮৫৩ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ৯ সেপ্টেম্বর ৮৬১ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করেছে।

৯ সেপ্টেম্বর বিপিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী ফার্নেস অয়েলের মজুত একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। বিগত বছরের হিসাবে মাত্র পাঁচদিনের মতো ফার্নেস অয়েল মজুত রয়েছে বিপিসির হাতে। তথ্য বলছে, ৯ সেপ্টেম্বর বিপিসিতে সমাপনী মজুত ছিল ৯ হাজার ৩৪৩ মেট্রিক টন। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে তিন মাসে বিপিসির বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলো দৈনিক গড়ে ২১শ ৮৮ টন ফার্নেস অয়েল বিক্রি করেছিল। এতে বর্তমান মজুতে মাত্র পাঁচদিনের কম সরবরাহ দিতে সমর্থ হবে বিপিসি।

বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আমদানি সূচি অনুযায়ী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সাতটি পার্সেলে দুই লাখ টনের মতো ফার্নেস অয়েল আনবে বিপিসি। এর মধ্যে ১২ সেপ্টেম্বর প্রথম পার্সেল, ১৬-১৮ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়, ২০-২২ সেপ্টেম্বর তৃতীয়, ২৫-২৭ সেপ্টেম্বর চতুর্থ, ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবরের মধ্যে পঞ্চম, ৬-৮ অক্টোবর ষষ্ঠ এবং ১৫-১৭ অক্টোবর আসবে সপ্তম পার্সেল। পাশাপাশি বেসরকারি আইপিপিগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ফার্নেস অয়েল আমদানির ঋণপত্র খুলেছে।

এ বিষয়ে কথা হলে ফার্নেস অয়েল নিয়ে আশার কথা জানিয়েছেন বিপিসির পরিচালক (বিতরণ) আসাদুল হক। তিনি বলেন, এমনিতে পিডিবি আগে চাহিদামাফিক ফার্নেস অয়েল নিতো না। এখন সংকটকালীন সেপ্টেম্বর মাসের জন্য দুই লাখ টনের চাহিদা দিয়েছে পিডিবি। তাদের চাহিদা পাওয়ার পর থেকে আমরা দ্রুত অতিরিক্ত ফার্নেস অয়েল আমদানির পদক্ষেপ নিয়েছি। পরিকল্পনার বাইরেও এ মাসে ফার্নেস অয়েলের দুটি পার্সেল বেশি আনা হয়েছে। আশা করছি পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোতে ফার্নেস অয়েল সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না।

পিডিবির উপ-সচিব (উৎপাদন) হেলালুর রহমান বলেন, ফার্নেস অয়েল বেশিরভাগ আমদানি করতে হয়। আমরা চলতি মাসের ৩ তারিখ সরকার থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা পেয়েছি। ইতোমধ্যে গত এক সপ্তাহে আইপিপিগুলোকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করেছি। তারাও ফার্নেস অয়েল আমদানির এলসি (ঋণপত্র) খুলছে। তাদের এলসি খোলার অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে চলতি মাসে আরও এক হাজার কোটি টাকার মতো আনুপাতিকভাবে পরিশোধ করা হবে।

তিনি বলেন, আমরা সেপ্টেম্বর মাসের জন্য দুই লাখের কিছু বেশি ফার্নেস অয়েল সরবরাহের জন্য চাহিদা দিয়েছি। আমরা যে পরিমাণ চেয়েছি, তাৎক্ষণিক সে পরিমাণ সরবরাহ দেওয়ার মতো সক্ষমতা বিপিসিরও নেই। তারাও বাড়তি ফার্নেস অয়েল আমদানির পদক্ষেপ নিয়েছেন। সবাই মিলে চেষ্টা করছি। আশা করছি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ২১ আগস্ট থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোন কোন প্ল্যান্টের কী পরিমাণ ফার্নেস সরবরাহ করা দরকার, তার একটি তালিকা আমরা বিপিসিকে দিয়েছি। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে সেপ্টেম্বরে লোড বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফার্নেস অয়েল আমদানির চালানগুলো শিগগির আসা শুরু হবে। এরপর থেকে ধীরে ধীরে লোড বাড়বে। সবমিলিয়ে বিদ্যুতের সংকট সমাধানে আমরা সবাই মিলে এগোচ্ছি।