স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যে এক মাস ধরে চলা উত্তেজনা, যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা এবং ইরানের পাল্টা জবাবের প্রভাব পড়েছে, তা বিশ্ব পুঁজিবাজারে চাপ তৈরি করেছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও স্পষ্ট; বিনিয়োগকারীদের আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার কারণে পুঁজিবাজারের সূচক ও লেনদেন কমেছে। তারপরও জানুয়ারী মাসের শুরু থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর ৯০০ শতাংশ বেশি বেড়েছে।

ফলে পুঁজিবাজারে যেন হঠাৎ করেই হাজির হয়েছে আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ার রূপকথার গল্প। যেখানে লোকসানে ডুবে থাকা একটি কোম্পানির শেয়ার হয়ে উঠেছে বিনিয়োগকারীদের কাছে ‘আলাদিনের চেরাগ’। মাত্র দুই মাসে কয়েকগুণ নয়, ১০ গুণ বেড়েছে একটি শেয়ারের দাম। এতে ১০ লাখ টাকার বিনিয়োগ মাত্র দুই মাসেই কোটি টাকা হয়ে গেছে। কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরের পর্যালোচনায় দেখা গেছে,

এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড: লোকসানে ডুবে থাকা এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের শেয়ার একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে হয়ে গেছে বিনিয়োগকারীদের কাছে ‘আলাদিনের চেরাগ’ এর মতো। মাত্র ১৭ কার্যদিবসের মধ্যে শেয়ার দাম বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়েছে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ছিল ১ টাকা ৩০ পয়সা। সেখানে থেকে টানা উত্থান শুরু হয়। ১৬ মার্চ এসে প্রতিটি শেয়ারের দাম দাঁড়ায় ৩ টাকা ৭০ পয়সায়।

অর্থাৎ এক মাসের কম সময়ে শেয়ারপ্রতি দাম বেড়েছে ২ টাকা ৪০ পয়সা। এ সময়ে পুঁজিবাজারে লেনদেন হয়েছে ১৭ কার্যদিবস। এই ১৭ কার্যদিবসে শেয়ারমূল্য বেড়ে হয়েছে ২ দশমিক ৮৫ গুণ। শুধু গত ১৭ কার্যদিবস নয়, প্রায় দুই মাসের বেশি সময় ধরে কোম্পানিটির শেয়ার দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এতে দুই মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ার দাম বেড়ে প্রায় ৯ গুণ হয়েছে। শতাংশের হিসাবে দাম বেড়েছে ৭৮০ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস: পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড গত ১৪ জানুয়ারি কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল মাত্র ৩৮ পয়সা। সেখান থেকে টানা উত্থানে ১৬ মার্চ এসে দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৮০ পয়সায়। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসে শেয়ারপ্রতি দাম বেড়েছে ৩ টাকা ৪২ পয়সা, যা শতাংশের হিসাবে ৯০০ শতাংশ বৃদ্ধি।

এই উত্থানের প্রভাব কেমন হতে পারে তা বোঝাতে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। কেউ যদি জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ১০ লাখ টাকার শেয়ার কিনতেন, তাহলে দুই মাসের মাথায় এখন সেই বিনিয়োগের বাজার মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ কোটি টাকা। অর্থাৎ মুনাফা ১০ লাখ টাকায় দুই মাস বিনিয়োগ করেই মুনাফা হয়েছে ৯০ লাখ টাকা।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস লিমিটেড: ২ মাসের মধ্যে কোম্পানিটির শেয়ার দাম বেড়ে প্রায় সাড়ে ১১ গুণ হয়ে গেছে। শতকরা হিসেবে দাম বেড়েছে ১ হাজার ৪৭ শতাংশ। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ১৪ জানুয়ারি ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল মাত্র ৩৭ পয়সা। সেখান থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ১৬ মার্চ লেনদেন শেষে প্রতিটি শেয়ারের দাম দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৯০ পয়সা। অর্থাৎ দুই মাসে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ৩ টাকা ৫৩ পয়সা বা ১ হাজার ৪৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।

অন্যভাবে বলা যায়, যদি কোনো বিনিয়োগকারী গত ১৪ জানুয়ারি ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ১০ লাখ টাকার শেয়ার কেনেন, তাহলে এখন তার বাজার মূল্য ১ কোটি ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এ হিসেবে ১০ লাখ টাকা খাটিয়ে দুই মাসেই মুনাফা পাওয়া গেছে ৯৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

অন্যদিকে, বাজারে তালিকাভুক্ত ভালো কোম্পানির শেয়ারদর এই সময়ে কমেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান আগেই মুনাফা কমার বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন লাভজনক কোম্পানির শেয়ারদর কমছে, তখন অবসায়নমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি হয়তো বাজার কারসাজির কারণেই ঘটেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, অর্থনীতির মন্দা ও ২০২৫ সালের কঠিন পরিস্থিতির কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংক ২০টি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে, যার মধ্যে নয়টিকে অবসায়নের অনুমোদন দেওয়া হয়। এক খাতের একাধিক প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে রূপান্তর বা পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে গেলে পুরো খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।