দেশীয় ও বৈশ্বিক নানা ইস্যুতে চাপের মুখে সরকার
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাংলাদেশে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় দেড় মাস হতে চলেছে। নতুন এই সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই পুরো বিশ্ব টালমাটাল হয়ে ওঠে ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশও ভোগান্তিতে পড়েছে জ্বালানী সরবরাহ ঠিক রাখতে। এরমধ্যেই দেশটির প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর সফর করছেন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ। যার মূল লক্ষ্য ঐ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শ্রমিকদের খোঁজ-খবর নেওয়া।
এছাড়া চলতি সপ্তাহে ভারত সফরের কথা আছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। বর্তমানে তিনিআছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে। এর আগে বাংলাদেশে সফর করে যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. পল কাপুর। সবমিলিয়ে পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যস্ত এবং একইসঙ্গে ইরান যুদ্ধের কারণে কিছুটা জটিল সময় পার করছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে দেশীয় ও বৈশ্বিক নানা ইস্যুতে সরকার কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে।
এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে চলছে জ্বালানি সংকট। বাংলাদেশও এই সংকটের বাইরে নয়। দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে সংকট। এরই মধ্যে সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত ও ব্যাংকের অফিস সময় কমিয়ে আনা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা পদ্ধতির বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। যদিও অনলাইন ও অফলাইন (সশরীরে) ক্লাস নিয়ে আলোচনা চলছে। শিক্ষক ও অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়টি মাথায় রাখার পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে হামের যে প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে, সেটিও বিবেচনায় রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে।
মার্চ মাসের শুরু থেকেই দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। ঈদের পর এই সংকট আরও বেড়েছে। চাহিদা ও যোগানের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার আশঙ্কা এবং গ্রাহকদের বাড়তি জ্বালানি তেল কেনার প্রবণতা এই সংকটকে আরও প্রকট করে তুলছে। সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের সংকট নেই বলা হলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত মানুষের মধ্যে তেল কেনার হিড়িক পড়েছে। প্রতিদিন পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।
জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে গরমকালে বোরো মৌসুমে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে দেশে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এবারের ঈদুল ফিতরের সময় হাসপাতালগুলোতে হামের চিকিৎসা নিতে শিশুদের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি।
ফলে দেশের এই পরিস্থিতিতে সরকার জ্বালানি তেলের তিন মাসের মজুত নিশ্চিতে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, আগামী তিন মাসের জন্য জ্বালানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি। এপ্রিল মাসের ডিজেলের চাহিদা পূরণের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে কিছু অসাধু চক্র দেশে জ্বালানির কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। এসব অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান তিনি। আজ রোববার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি কথা জানান।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, যাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি ছিল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তারা অনেকেই ফোর্স মেজর (চুক্তি পালন করতে না পারলে দায় মুক্তি সংক্রান্ত ধারা) ডিক্লেয়ার করেছে। এজন্য জ্বালানি সংগ্রহে আমাদের নতুন নতুন উৎস অনুসন্ধান করতে হয়েছে। আমরা কিছু ভালো সোর্স পেয়েছি। তাদের অনেকের সঙ্গে আমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। যদি এটা বাস্তবায়ন হয় আমরা প্রয়োজনে তাদের কাছ থেকে আগামী তিন মাসের জ্বালানি সংগ্রহ করার জন্য সব প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। এটা ডিজেলের ক্ষেত্রে। আর পেট্রল ও অকটেনের ক্ষেত্রে আনুমানিক তিন মাসের মতো আমরা কিন্তু নিশ্চিত করতে পেরেছি, অর্থাৎ আমাদের কাছে সেটা রেডি।
এছাড়া ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন ইস্যুতে চাপ বাড়ছে। সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোট জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ইতিমধ্যে রাজপথে নেমেছে। পাশাপাশি দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাবও নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি ও হাম ছাড়াও বেশ কিছু ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপও রয়েছে সরকারের ওপর।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে। দায়িত্ব গ্রহণের দেড় মাসের মাথায় সরকার একাধিক ইস্যুতে চরম চাপ ও সংকটে পড়েছে। সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও মূল্যবৃদ্ধি। এর পাশাপাশি দেশে হঠাৎ হামের প্রাদুর্ভাবে বিপুলসংখ্যক শিশুর মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এদিকে কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশে জ্বালানি তেল সংগ্রহে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে, যা জনমনে ক্ষোভ তৈরি করছে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট দেখা দিলে চার চাপে সরকার কলকারখানা বন্ধ হয়ে রফতানি আয় কমে যেতে পারে এবং বেকারত্ব বাড়তে পারে-যা সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়াবে।
এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, সংকট চলছে, সরকার তা মোকাবিলা করছে। জনগণ বিএনপিকে সরকারে বসিয়েছে, তাদের সেবা নিশ্চিত করতে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তেল ও হামসহ প্রতিটি সমস্যাই স্বাভাবিক। বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মানুষের আতঙ্কও কমবে। বর্তমানে আতঙ্কের কারণে যার ২০০ লিটার তেল প্রয়োজন, তিনি ১ হাজার ৫০০ লিটার পর্যন্ত সংগ্রহ করছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মন্ত্রী জানান, ইরান যুদ্ধের আগে দেশে দেড় দিনে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল বিক্রি হতো, তা এখন মাত্র দুই ঘণ্টায় বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত কেনাকাটার কারণে সরবরাহ ঠিক থাকলেও বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধির ফলে পাম্পগুলোতে তেল দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী মজুদ রয়েছে এবং বিকল্প উৎস থেকে আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হবে বলে তিনি জানান। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই এবং চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বজায় আছে। তবুও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, নতুন সরকার হিসেবে কিছু সংকট সামনে এসেছে। জ্বালানি ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে। তবে সরকার তা সফলভাবে মোকাবিলা করছে এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে। তার মতে, বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব থাকলেও তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে, ফলে নিত্যপণ্যের বাজার এখনও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। তেলের ক্ষেত্রে সমস্যা মূলত ব্যবস্থাপনাগত এবং অতিরিক্ত মজুদের কারণে তৈরি হয়েছে। সরকার মজুদকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক চাপও বাড়ছে। হামের প্রাদুর্ভাব সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও আইসিইউ সংকট দেখা দিয়েছে। দ্রুত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন টিকাদান কর্মসূচিতে স্থবিরতা এবং ২০২৪-২৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে টিকার ঘাটতি তৈরি হয় বলে জানা গেছে।
ফলে দেশে হামের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই অন্তত ৩৮ থেকে ৫০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা ও রাজশাহীসহ দেশের প্রায় ৫৬টি জেলায় এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের তীব্র সংকট রয়েছে।
বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে সময়মতো হামের টিকা নিশ্চিত করা হয়নি। বর্তমান সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং আমরা সে বিষয়ে অবহিত করেছি। সরকারের উদ্যোগ ও জনগণের সচেতনতার মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এরই মধ্যে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বও প্রকাশ্যে এসেছে। সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে সংসদের উত্তাপ এখন রাজপথে গড়িয়েছে। গণভোটের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয় জোট বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।
বিরোধী দলগুলোর দাবি, গণভোটে জনগণ জুলাই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু সরকার সংবিধান পূর্ণাঙ্গ সংস্কার না করে নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী কিছু সংশোধন করতে চাচ্ছে, যা জনরায় উপেক্ষার শামিল। এ দাবিতে ৭ এপ্রিল বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। ওই বৈঠক থেকে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে। জামায়াতসহ অন্যান্য দল বিক্ষোভের পাশাপাশি গণসংযোগ, লিফলেট বিতরণ, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে জনমত গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে। তাদের দাবি উপেক্ষিত হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপির অবস্থান, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে কোনো উদ্যোগের আইনি ভিত্তি নেই। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন জরুরি। এ জন্য সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংশোধন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। শিগগিরই এ কমিটি গঠন করা হবে। বিরোধী দলের আন্দোলনকে বিএনপি ‘অহেতুক’ বলে মনে করছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, বিরোধী দলের আন্দোলন অবিবেচনাপ্রসূত। বিএনপি সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্যদিকে বিএনপির রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট এখন আন্তর্জাতিক বাস্তবতা।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও অধ্যাদেশ বাতিল ইস্যুতে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। সরকারের উচিত সুস্পষ্ট রূপরেখা দিয়ে অবস্থান পরিষ্কার করা। তার মতে, সরকার কিছুটা চাপের মুখে থাকলেও এসব সমস্যা সমাধানযোগ্য এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চাপ অনেকটাই কমে আসবে।



