প্রণব মজুমদার: ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থনীতির স্বপ্ন বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে? এটা বিএনপি সরকারের কঠিনতম এক কর্মপরিকল্পনা বটে। কেননা দেশের অর্থনীতির বাস্তবতা বেশ কঠিন। অনিয়ম, দুর্নীতি, লোভ, ভোগ, অসততা ও অলসতা আমাদের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। অর্থনীতির এই ভয়াবহ চিত্র বহুদিনের। বেশ কবছর ধরে বেসরকারি-সরকারি বিনিয়োগ নেই বললেই চলে।

কমে গেছে সাধারণ জনগণের আয়, হ্রাস পেয়েছে কর্মসংস্থান। দেশে কর-জিডিপির হার খুবই কম, মাত্র ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ! সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও সামাজিক অপরাধ বেড়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়েছে, বাড়ছে সরকারের ঋণ গ্রহণ। অন্যদিকে কমেছে আমানতের ওপর সুদ। মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি!

সরকারের নিজস্ব আয় নেই। সরকার দেশ পরিচালনার নির্বাহী সহায়ক শক্তি মাত্র। জনগণের আয়, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, দাতা, এনজিও এবং প্রবাসী আয়ের ওপর চলে সরকারের নির্বাহী কাজ। ৬-৭ বছর আগে দেশে অতিমারি কোভিড, রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ, জ্বালানি তেল নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অশুভ পরিস্থিতি, ইরানে যুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটা প্রায় অথর্ব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলেছে দেশ। আর্থিক খাতের চরম অব্যবস্থাপনা ছাড়াও এই বিষয়গুলো দেশের অর্থনীতিকে বেশ সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে।

অবশেষে ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দুর্যোগময় সময়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি।
যেকোনো দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হচ্ছে পুঁজিবাজার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, বন্ড মার্কেট এবং ব্যাংক-বিমা। এসবের প্রবৃদ্ধি হলে অর্থনীতি মজবুত ও শক্তিশালী হয়। দুঃখজনক যে অর্থনীতির কোনো খাতের সূচকই অনুকূলে নেই; সামষ্টিক অর্থনীতিতে আমরা স্থবিরতা দেখতে পাচ্ছি।

অর্থনীতির নাজুক এই পরিস্থিতির মধ্যে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রস্তাবিত বাজেটের আয় ও ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী একটি বিশাল ঘাটতিও রয়েছে।

আমার আলোচনা দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে। পুঁজিবাজার নিয়ে নতুন সরকার কী ভাবছে? পুঁজিবাজার উন্নয়নে এবার অনেক আশ্বাস আছে! বাজারকে গভীর, স্বচ্ছ, বহুমাত্রিক ও আস্থাভিত্তিক করতে মূলধন সংগ্রহ সহজীকরণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে– এমনটাই জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া সহজ করতে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং অনুমোদন ও পরিপালন-সংক্রান্ত অস্পষ্টতা কমানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে আইপিও প্রক্রিয়া সময়নির্ধারিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হবে। আবেদন দাখিল, আনুষঙ্গিক দলিলাদি যাচাই-বাছাই, ফি পরিশোধ, সংশোধন ও অনুমোদনের ধাপ অনলাইনে সম্পন্ন করা হবে। ইস্যুকারী কোম্পানি, ইস্যু ম্যানেজার, স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে করা হবে।

পেনশন তহবিল, বিমা প্রতিষ্ঠান, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে। করপোরেট বন্ড বাজার সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে পৌর বন্ড ইস্যুর ব্যবস্থা করা হবে। সরকারি ও বেসরকারি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প অর্থায়নে বন্ড, সুকুক, অবকাঠামো তহবিলসহ বিভিন্ন ফাইন্যান্সিং ইনস্ট্রুমেন্টসের ব্যবহার বাড়ানো হবে।

বিগত দেড় দশকের লাগামহীন কারসাজি ও প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটে ধ্বংস হওয়া পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফেরাতে বড় ধরনের নীতিনির্ধারণি বা পলিসি প্রণোদনা দিয়েছে নতুন সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃত্রিম নগদ সুবিধার পরিবর্তে বাজারের গভীরতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে বেশ কিছু বৈপ্লবিক আইনি ও কারিগরি সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন।

বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত নগদ লভ্যাংশ নিশ্চিত করতে বাজেটে বোনাস শেয়ারের ওপর সরাসরি ১০ শতাংশ হারে কড়া শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যতীত অন্য যেকোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি কর-পরবর্তী নিট আয়ের ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দিলে বা নগদ লভ্যাংশের চেয়ে বোনাস শেয়ার বেশি দিলে এই অতিরিক্ত কর দিতে হবে, যা কাগুজে লভ্যাংশ বন্ধে সাহায্য করবে।

পুঁজিবাজারের তারল্য সংকট কাটাতে শেয়ার নিষ্পত্তির সময় বর্তমানের ‘টি+২’ থেকে ধাপে ধাপে কমিয়ে সরাসরি রিয়েল-টাইম বা ‘টি+০’ করার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে শেয়ার বিক্রির সঙ্গে সঙ্গেই বিনিয়োগকারীরা টাকা তুলতে পারবেন এবং একই দিনে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির নতুন শেয়ারে আইপিও ও অনলাইন প্রক্রিয়ায় দ্রুত বিনিয়োগ করতে পারবেন।

বৈদেশিক পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট আকর্ষণ করতে বিদেশি ও অনাবাসিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজেটে নজিরবিহীন বড় ছাড়ের আইনি নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্জিত লভ্যাংশ এবং শেয়ার বিক্রির লব্ধ অর্থ নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যাওয়ার যাবতীয় প্রক্রিয়া মাত্র এক কর্মদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে, যা আন্তর্জাতিক তহবিল টানবে।

ব্যাংক খাতের ওপর থেকে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ঋণের ক্ষতিকর চাপ কমাতে বিকল্প অর্থায়ন হিসেবে বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণকে বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বড় বড় মেগা প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বিশেষায়িত ‘পৌর বন্ড’ ও সুকুক (ইসলামী বন্ড) চালু করা হচ্ছে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ারের পাশাপাশি একটি নিরাপদ ও নির্দিষ্ট আয়ের নির্ভরযোগ্য বিকল্প তৈরি করবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ও অর্থ বিল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশের শিল্পায়ন ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করহারে কোনো সরাসরি পরিবর্তন আনা হয়নি, অর্থাৎ আগের হারই বহাল রাখা হয়েছে। এছাড়া পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ থেকে মূলধনী মুনাফায় পূর্বের যে করহার রয়েছে, তাতেও কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের পুঁজিবাজার উন্নয়নে সহায়ক নীতিমালা নেওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

তার মতে, বাজেট প্রস্তাবনায় পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ বাজার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। মমিনুলের মতে, প্রথমবারের মতো পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী নিয়োগ এবং অর্থমন্ত্রীর বিভিন্ন বক্তব্যে পুঁজিবাজারের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ বাজার-সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে নতুন আশাবাদ ও ইতিবাচক প্রত্যাশার সৃষ্টি করেছে।

তিনি বলেন, ‘রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ এবং পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদারে প্রস্তাবিত বাজেটে গৃহীত উদ্যোগ দেশের পুঁজিবাজারের আধুনিকায়নে একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। এ উদ্যোগের ফলে বাজার পরিচালনায় দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি একটি সমন্বিত, কার্যকর ও শক্তিশালী বাজার অবকাঠামো গড়ে উঠবে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’

ডিএসই চেয়ারম্যান বিশেষভাবে নিটা (এনআইটিএ) হিসাব পরিচালনা প্রক্রিয়া সহজীকরণের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ দেন। এ উদ্যোগ পুঁজিবাজারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাজারের গভীরতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ডিএসই এরই মধ্যে বিদ্যমান টি+২ সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা থেকে টি+১ এবং পর্যায়ক্রমে টি+০ সেটেলমেন্ট ব্যবস্থায় রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে লেনদেন নিষ্পত্তি আরও দ্রুত, নিরাপদ ও দক্ষ হবে এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মত বাজার অবকাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ছিলেন সিএসইর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তিনি ১ এপ্রিল ১৯৯৫ থেকে ২০০১ সালের ২৪ ডিসেম্বর অবধি সিএসইর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পুঁজিবাজারের গতি-প্রকৃতি বোঝেন তিনি। কিন্তু ২৪ বছরে পুঁজিবাজারে যে জঞ্জাল ও পাহাড়সম সমস্যা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা সমাধান করা খুবই কঠিনতম কাজ!

দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে (জিডিপি) পুঁজিবাজারের অবদান প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ, যার আদর্শ মান হলো ৪০ শতাংশ। ব্যবসা বাড়িয়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে অতিরিক্ত পুঁজি সংগ্রহে এ বাজারের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সুশাসন নেই। লুটেরা শ্রেণির শেয়ার কারসাজিতে বিনিয়োগকারীর পুঁজি লুণ্ঠন এবং একাধিক শেয়ার কেলেঙ্কারির বিচারহীনতা দেশের পুঁজিবাজারকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে বর্তমান সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তা ভালো; কিন্তু এর সঠিক বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন।

পতনবৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের দুটি পুঁজিবাজার। এ অবস্থা বহু বছরের। ১৭ বছরে দেশের পুঁজিবাজার সংকুচিত হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। দেশের শেয়ার তথ্যভাণ্ডার সেন্ট্রাল ডিপজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) উপাত্ত অনুযায়ী, বিও (ইবহবভরপরধষ ঙহিবৎং) হিসাবধারীর সংখ্যা ১৬ লাখ ৩৯ জন, ২০১০ সালে যা ছিল ৩৪ লাখ (যদিও ওই সময় বাজার ‘বাবল’ বা কৃত্রিমভাবে স্ফীত ছিল)। দেশের পুঁজিবাজারে আস্থার সংকটের কথা দীর্ঘ সময় ধরেই আলোচিত। বাজারে আস্থা পুনরুদ্ধারে কেউই আন্তরিক হয় না।

১৯৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম চৌধুরী কমিটির প্রকাশ করা সেই তদন্ত প্রতিবেদনের বিচার আজও হয়নি; বরং অভিযুক্তরা পুনর্বাসিত হয়েছেন। ২০১০ সালে দেশের পুঁজিবাজারে পুনরায় কেলেঙ্কারি ঘটে। আবারও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা নিয়ে তখন সরকারের মেলোড্রামা মঞ্চস্থ হয়! কমিটির প্রধান, প্রবীণ ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদকে অপ্রত্যাশিত এবং বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়।

আজ সর্বজনশ্রদ্ধেয় খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বেঁচে নেই! সময় অনেক অতিবাহিত হয়েছে, কালক্ষেপণ আর নয়। আমিরুল ও খালেদ কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে অপরাধীদের প্রশ্রয় না দিয়ে যোগ্য বিচারসহ কমিটির সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করার জোর পরামর্শ দিই সরকারকে। তা করা গেলে দেশের পুঁজিবাজারে আস্থা বা বিশ্বাস ফেরানো সম্ভব।

দীর্ঘ সময়ের পুঁজিবাজার বিশ্লেষক, অর্থ ও হিসাববিজ্ঞানের ছাত্র এবং সাংবাদিক হিসেবে পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি তা হলো:

১. ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন, যেমন—দশ বছর ধরে লাভে থাকা দেশি-বিদেশি কোম্পানির আইপিও (ওহরঃরধষ চঁনষরপ ঙভভবৎরহম) আনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ২. তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে কোম্পানি-সংশ্লিষ্ট নন, এমন অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন, বাণিজ্য ও পরিসংখ্যান বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা জানা ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ পরিচালক পদে কমপক্ষে ৩ বছর মেয়াদে নিয়োগ দিতে হবে। কোনো অযথা হস্তক্ষেপ নয়; তারা যেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) তা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. বিও হিসাবধারীর হিসাবে মূলধনী লাভ কর (ঈধঢ়রঃধষ এধরহ ঞধী) প্রত্যাহারসহ সিডিবিএল ফি কমাতে হবে। ৪. ব্রোকারেজ হাউজগুলো যাতে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে হিসাবধারীর সম্মতি ছাড়া শেয়ার ট্রেডিংয়ে অংশ না নিতে পারে, সেজন্য বিএসইসির ভিজিল্যান্স টিমের নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। ৫. প্রাথমিক শেয়ারে আগের নিয়মে ফেরা উচিত। সবাইকে সমবণ্টন নয়; বরং লটারির মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যে শেয়ার লট পুরোটা দেওয়া উচিত। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা সুনিশ্চিত করতে হবে।

৬. শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার আছে তথ্য জানার। বার্ষিক সাধারণ সভা (অএগ) আগের মতো প্রকাশ্যে বাণিজ্যিক এলাকার ভেন্যুতে সম্পন্ন করতে হবে। ৭. পুঁজিবাজার বিনিয়োগে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিএসইসিকে নিয়মিত প্রচলিত সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক বিজ্ঞাপন প্রচারে যেতে হবে। ৮. নগদ লভ্যাংশ পরিমাপ করা হয় শেয়ারের অভিহিত মূল্যের (ঋধপব ঠধষঁব) ওপর; তা বাজারমূল্যের ওপর হওয়া কাম্য। নগদ লভ্যাংশের চেয়ে স্টক ডিভিডেন্ড বিনিয়োগকারীর উৎসাহ ও আস্থা বাড়ায়। আস্থা বৃদ্ধির জন্য তা করা জরুরি।

৯. পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিএসইসিকে শক্তিশালী ও কার্যকর উপদেষ্টা কমিটি গঠন করতে হবে। ১০. পুঁজিবাজারের উন্নয়নের স্বার্থে গুজব রটনাকারীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা আদালত গঠন করা জরুরি।
প্রণব মজুমদার কথাসাহিত্যিক ও ‘অর্থকাগজ’ সম্পাদক। ই-মেইল: reporterpranab@gmail.com