সাখাওয়াত হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাজেট পরবর্তী পুঁজিবাজার সূচকের উঠানামার মধ্যে দিয়ে লেনদেন হচ্ছে। একটানা যেমন সূচকের উত্থান হচ্ছে না, তেমনি একটানা সূচকের পতন হচ্ছে না। কারণ সূচকের উঠানামার মধ্যে স্থিতিশীলতার পথে হাঁটছে পুঁজিবাজার। তাছাড়া বাজেটে সংস্কারমূলক প্রস্তাব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থায় নতুন নেতৃত্ব পুঁজিবাজারে নতুন সম্ভাবনার সঞ্চার করেছে।

এছাড়া বিনিয়োগকারীদের পছন্দ ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ওপর ভর করেই প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে পুঁজিবাজারের আচরণ। সাম্প্রতিক সময়ে বাজার বিশ্লেষণ ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে সুনির্দিষ্ট কিছু কোম্পানি ও নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতকে কেন্দ্র করেই বাজারের গতি নির্ধারিত হচ্ছে। বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং বিনিয়োগ ঝুঁকির মাত্রার ওপর নির্ভর করেই সাধারণত তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।

বিশ্লেষকদের মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত বাজারে পূর্ণাঙ্গ আস্থা ফিরে না আসছে, ততক্ষণ এ ধরনের প্রবণতাই অব্যাহত থাকবে। এক সময় পুঁজিবাজারে মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানির প্রতিই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি ছিল। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে এসব কোম্পানির লভ্যাংশকে প্রাধান্য দিতেন।

কিন্তু পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়লেও বাজারের গভীরতা সেই অনুপাতে বাড়েনি। অর্থাৎ চাহিদার বিপরীতে ভালো শেয়ারের সরবরাহ বৃদ্ধি পায়নি। এমনকি গত তিন বছরে ভালো বা খারাপ কোনো ধরনের উল্লেখযোগ্য কোম্পানিই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি।

ফলে অর্থবছরের শেষ কয়েকটি দিন পুঁজিবাজারে বরাবরই একটি বিশেষ সময়। এ সময় বাজারের পর্দায় যেমন সূচকের ওঠানামার মাত্রা বাড়ে, তেমনি বিনিয়োগকারীদের মনেও জমে নানা প্রশ্ন। কেউ বছরের হিসাব মেলান, কেউ খোঁজেন নতুন অর্থবছরের সম্ভাবনা। তাই জুনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসের লেনদেন নিয়ে কৌতূহল যেমন স্বাভাবিক, তেমনি জুলাই মাসকে ঘিরে নতুন আশার আলোচনাও অমূলক নয়।

গত কয়েক সপ্তাহে বাজার এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে গেছে। একদিকে ছিল তীব্র দরপতনের চাপ, অন্যদিকে টানা কয়েকটি ঊর্ধ্বমুখী সেশন আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে পুঁজিবাজার কেবল সংখ্যার খেলা নয়; এটি প্রত্যাশা, আস্থা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির প্রতিফলন।

অর্থবছরের শেষ কার্যদিবসে সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তাঁদের পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাস করেন। অনেকেই বছরের মুনাফা বাস্তবায়ন করেন, আবার কেউ নতুন বিনিয়োগের জন্য নগদ অর্থ প্রস্তুত রাখেন। ফলে শেষ দিনে বিক্রির চাপ কিছুটা বাড়া অস্বাভাবিক নয়। তবে একই সঙ্গে একটি বাস্তবতাও রয়েছে সাম্প্রতিক দর-সংশোধনের ফলে অনেক মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ারের দাম তুলনামূলক আকর্ষণীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে।

ফলে বাজারে নতুন ক্রেতাদের উপস্থিতিও বাড়তে পারে। এ কারণেই সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসের বাজারে ওঠানামা থাকলেও তা আতঙ্কের কারণ নয়; বরং অর্থবছরের শেষ পর্যায়ের স্বাভাবিক সমন্বয় হিসেবেই দেখা উচিত। কিন্তু আলোচনার বড় বিষয় মঙ্গলবারও নয়; বরং জুলাই মাস।

জুলাই মানেই নতুন অর্থবছরের শুরু। নতুন বাজেট, নতুন পরিকল্পনা, নতুন বিনিয়োগ এবং নতুন প্রত্যাশার সূচনা। পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। কারণ জুনের ক্লোজিং শেষ হলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ওপর বছরের শেষের চাপ অনেকটাই কমে যায়। তখন তাঁদের নজর ঘুরে যায় ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ কৌশলের দিকে। এই পরিবর্তন বাজারে তারল্য ও আস্থার পরিবেশ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারকে আরও আধুনিক ও গভীর করার যে নীতিগত দিক নির্দেশনা এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আইপিও প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করা, নতুন বিনিয়োগ পণ্য চালুর উদ্যোগ এবং বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা এসব উদ্যোগ কেবল সূচক বাড়ানোর জন্য নয়; বরং বাজারের ভিত্তি আরও মজবুত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। স্বল্পমেয়াদে এ কঠোরতা কিছু অস্বস্তি তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে একটি সুশৃঙ্খল বাজার গড়ে তুলতে কার্যকর নজরদারির কোনো বিকল্প নেই। বিনিয়োগকারীরা যদি ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন যে নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য কারসাজি রোধ করা, তাহলে এই আস্থাই ভবিষ্যতের বাজারকে আরও স্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

অন্যদিকে, সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও বাজারকে সহায়তা করতে পারে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা, আমদানি ব্যয়ের সম্ভাব্য ভারসাম্য এবং আর্থিক খাতে তারল্য ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন এলে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় ও মুনাফায় তার ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোম্পানির আয়ই শেয়ারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে আশার পাশাপাশি সতর্ক থাকারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কর নীতির কিছু পরিবর্তন, বিনিয়োগে কর-সুবিধা হ্রাস এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা বাজারের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থাকবে। তাই জুলাই এলেই বাজার শুধু ঊর্ধ্বমুখী হবে এমন সরল সমীকরণ বাস্তবসম্মত নয়। পুঁজিবাজারের পথ কখনোই সরলরেখায় এগোয় না; সেখানে যেমন সংশোধন থাকবে, তেমনি পুনরুদ্ধারও থাকবে।

পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখন সাময়িক উচ্ছ্বাস নয়; প্রয়োজন টেকসই আস্থা। সেই আস্থা তৈরি হবে সুশাসন, স্বচ্ছতা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে। সূচকের কয়েক দিনের উত্থান বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না; বরং ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে প্রতিষ্ঠানগুলোর মৌলিক শক্তি এবং নীতিনির্ধারকদের বিশ্বাসযোগ্যতা।

জুনের শেষ বিকেল তাই কেবল একটি অর্থবছরের সমাপ্তি নয়; এটি নতুন সম্ভাবনারও দুয়ার। আগামীকালের লেনদেনে হয়তো কিছু অস্থিরতা থাকবে। কিন্তু যদি সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসে, তাহলে জুলাই পুঁজিবাজারের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। পুঁজিবাজার শেষ পর্যন্ত গুজবের নয়, ধৈর্যের বাজার। যারা স্বল্পমেয়াদি আবেগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেন, তারাই সাধারণত এই বাজারের প্রকৃত সম্ভাবনার অংশীদার হন।