অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি রোধে হার্ডলাইনে বিএসইসি
সাখাওয়াত হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাংলাদেশের পুঁজি বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সুলত এ আস্থাহীনতার পেছনে বিভিন্ন কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার বড় ভূমিকা রাখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং অসত্য তথ্যভিত্তিক প্রচারণা অনেক সময় শেয়ারের দামে অস্বাভাবিক উত্থান-পতন সৃষ্টি করছে, যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজি বাজারে গুজব নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার বিস্তারের ফলে এখন গুজব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে কোনো কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা বা ব্যবসায়িক সক্ষমতার পরিবর্তে অপপ্রচার ও অনুমাননির্ভর তথ্য অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
ফলে ডিএসইর গত সাত দিনের কার্যক্রমে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, পুঁজিবাজারে কোনো ধরনের কারসাজি বা কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি সহ্য করবে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা। গত সপ্তাহে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির দায়ে ‘উসমানিয়া গ্লাস’ এবং ‘মেঘনা পেট এর শেয়ার লেনদেন মাঝপথে স্থগিত করা হয়। এর ঠিক আগের কার্যদিবসে একইভাবে ‘জিল বাংলা সুগার মিলস’ এর লেনদেনও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। এ ছাড়া ধারাবাহিক লোকসানের কারণে মূলধন হারিয়ে ফেলা কোম্পানিগুলোর বিষয়েও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী লোকসানি কোম্পানি ‘ইনটেক লিমিটেড’ কে মূল বাজার থেকে সরিয়ে ‘জেড’ক্যাটাগরিতে (জাঙ্ক স্টক) স্থানান্তর করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন ত্বরিত এবং কঠোর পদক্ষেপের ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি বার্তা গেছে যে, তাদের বিনিয়োগ এখন অনেক বেশি সুরক্ষিত। ফলে গুজব ও কারসাজিকারীদের দৌরাত্ম্য কমে আসায় বাজারে সুস্থ ধারার লেনদেন শুরু হয়েছে।
আস্থা বৃদ্ধির নেপথ্যে পুঁজিবাজারের এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের পেছনে বেশ কয়েকটি বড় কারণ দেখছেন বাজার বিশ্লেষক ও ব্রোকারেজ হাউস সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রথমত নবনিযুক্ত বিএসইসি চেয়ারম্যানের নানামুখী বিনিয়োগ-বান্ধব সিদ্ধান্ত বাজারকে চাঙ্গা করেছে। ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জটিল নিয়ম কিছুটা শিথিল করে অর্ধবার্ষিক করার প্রতিশ্রুতি এবং মার্জিন ঋণ নীতিমালার বাস্তবমুখী সংস্কারের উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের মাঝে দারুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
দ্বিতীয়ত বাজেটোত্তর সময়ে প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের পুঁজিবাজার নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ বিনিয়োগকারীদের ভীতি দূর করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজারে নতুন করে পোর্টফোলিও বাড়াতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে সামনে বেশ কিছু বড় কোম্পানির বোর্ড সভা থাকায় সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগ মহল অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাবাদী অবস্থানে রয়েছে।
মুলত দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দীর্ঘ মন্দা ও অস্থিরতা কাটিয়ে অবশেষে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নানামুখী নীতিগত সংস্কার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার যুগোপযোগী পদক্ষেপের ফলে বাজারে গতিশীলতা ফিরে এসেছে।
ফলে সদ্য সমাপ্ত জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক উর্ধ্বমুখী থাকার পাশাপাশি বাজার মূলধন ও লেনদেনের পরিমাণে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সাধারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি পাওয়ায় পুঁজিবাজারে এই ইতিবাচক ধারার সৃষ্টি হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এক দিনে ১৪০০ কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হওয়া সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম একটি মাইলফলক, যা বাজারে বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ সক্রিয়তার বহিঃপ্রকাশ। তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিমুক্ত এবং ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারের দিকে ঝুঁকছেন বলেই নির্দিষ্ট কিছু খাতে বড় আকারের তারল্য প্রবাহ তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, নতুন কমিশনের চেয়ারম্যান অনেক জানেন। তিনি নিয়মগুলো সহজ করছেন, যার ফলে বিনিয়োগকারীরা সামনে আশা দেখছেন। সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই কঠোর পদক্ষেপ ও নজরদারির প্রশংসা করে তিনি বলেন, পুরো পৃথিবীতে সবসময় শেয়ার বাজারে সতর্কতা আছে।
মার্কেটে আপস অ্যান্ড ডাউন থাকে, তবে জুয়াড়িরা যাতে বাজার নিয়ে খেলতে না পারে সে জন্য ডিএসইর সার্ভাইলেন্স (পর্যবেক্ষণ) ও আইনি ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটা একটা ভালো দিক। তবে মার্জিন লোনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সংস্কার এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মার্জিন লোন জেড এবং বি ক্যাটাগরিতে বন্ধ। এ ক্যাটাগরিতে তাও সেটা শর্ত সাপেক্ষে। এর ফলে আগের মতো খারাপ কোম্পানি নিয়ে কারসাজি করার সুযোগ আর থাকবে না এবং বাজার ডিস্ট্রিবিউশন আরও ব্রড ও পার্টিসিপেটরি হবে।
এ ছাড়া বাজেটে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাজেটোত্তর সময়ে প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের পুঁজিবাজার নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ বিনিয়োগকারীদের ভীতি দূর করেছে। সরকারের ট্যাক্স বা কর সংক্রান্ত কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, বাজেট পাশের সময় ফাইন্যান্স বিলে শেয়ার বাজারের জন্য অনেকগুলো ট্যাক্স রিলেটেড রিলিফ (কর ছাড়) দেওয়া হয়েছে।
যেমন: ব্যক্তি শ্রেণীর জন্য ডিভিডেন্ড ইনকামের (লভ্যাংশ আয়) ওপর চূড়ান্ত কর ১৫ শতাংশ করা এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট কর কমানোর মতো অত্যন্ত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বাজারকে চাঙ্গা করতে বড় ভূমিকা রাখছে।
পুঁজিবাজার সামনে আরও অনেক বড় হবে এমন আশা ব্যক্ত করে অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বাজারে নতুন কোম্পানি আসবে, মাল্টিন্যাশনাল থেকে আসবে, লোকাল ভালো কোম্পানিগুলো থেকে আসবে আর হচ্ছে সরকারি কোম্পানিগুলো থেকে আসবে। এই তিন সোর্স থেকে সাইড বাই সাইড বন্ড মার্কেট আর সুকুক মার্কেট- এগুলোতে উন্নতি হবে। ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।
তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের এই সমস্যা দূর করতে সরকারের সর্বোচ্চ মহলেরও এখন মূল অগ্রাধিকার পুঁজিবাজারের উন্নয়ন করা। ব্যাংক খাতের সংকটের দিকে ইশারা করে তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এখন ব্যাংকগুলাকে সব বিপদে ফেলেছে। এই যে ব্যাংকের ক্লাসিফাইড লোন, এগুলা তো ৯০ শতাংশ লং টার্ম লোন, যার মেয়াদ ১০ বছর ১২ বছর। উচিত ছিল পুঁজিবাজার থেকে নেওয়া।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিএসইর সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এটা স্পষ্ট যে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আবার সুদৃঢ় অবস্থানে ফিরে আসছে। সূচক ও লেনদেনের এই ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলে এবং বিএসইসির সংস্কার কার্যক্রম যদি আরও গতিশীল হয়, তবে আগামী মাসগুলোতে পুঁজিবাজার দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।



