পুঁজিবাজারে গতিশীলতা ফেরাতে সরকারের একগুচ্ছ পরিকল্পনা
বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির সরকারের গঠনের পেরিয়েছে ছয় মাস। সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল অনেক। এছাড়া বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগের আমলে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায়। পুঁজিবাজারকে ঘিরে দুষ্টচক্রের হাত থেকে বাজারকে গড়ে তোলাই ছিল অন্যতম। পাশাপাশি অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে হাতে নেওয়া সংস্কার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া চ্যালেঞ্জ ছিল।
সেই সাথে বাজারকে সঠিক পথে ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থার পরিবেশ তৈরিও জরুরি ছিল। নতুন সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের চাওয়া আপাতত বাজারকে নিজের পথে চলতে দেওয়া। পুঁজিবাজারে গতিশীলতা ফিরিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে সরকার ইতিমধ্যে একগুচ্ছ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
বিএনপির সরকার গঠনের কিছুদিন পরেই মাসুদ খানকে চেয়ারম্যান করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পুনর্গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশের বহুজাতিক কোম্পানির দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এমন মানুষকে নিয়োগ দিয়ে সরকার গত কয়েক বছরের বিশব্বিদ্যালয়ের শিক্ষককেন্দ্রিক প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসে। তার কমিশনের শুরুতে বিনিয়োগকারীদের মনে আশা জাগায়। হু হু করে সূচক ও লেনদেন বাড়তে শুরু করে। তবে বিনিয়োথাকারীদের এই হাসি বেশিদিন স্থানী হয়নি। এখন টানা পতনের কবলে পড়েছে পুঁজিবাজার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে কমিশন বেশ কিছু কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাজার সংস্কারে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, বিনিয়োগ শিক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মাসুদ খান বিএসইসির চেয়ারম্যান হয়ে আসার পর প্রথমে পুঁজিবাজারের অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ করেন। বাজার সংশ্লিষ্টদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমেই বিগত কমিশনের আমলে করে দেওয়া মার্জিন রুল বিধিমালা পরিবর্তনের জন্য কাজ শুরু করেন।
এরপর বাজারের গভীরতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ টানতে কমিশন বাংলাদেশে অনেক বড় দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করছে। কমিশন মনে করে, এসব ভালো কোম্পানিকে দ্রুত পুঁজিবাজারে আনা না গেলে বাজারের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হবে না। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে কয়েকটি বড় ও ফ্ল্যাগশিপ কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনার জন্য বিএসইসির কাজ অব্যাহত রয়েছে সূত্র জানিয়েছে।
তবে বিএসইসির এই কাজের প্রধান বাধা কোম্পানির অনাগ্রহ। সরকারি এবং বহুজাতিক সবার জন্যই এটি প্রযোজ্য। কোন ভাল কোম্পানিই নিজে থেকে বাজারে আসতে চায় না। সেজন্যে সিকিউরিটিজ আইনের ক্ষমতা প্রয়োগ করে জনস্বার্থে নির্দিষ্ট কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি-পিআইসি’র সংজ্ঞাও আইনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে বলে কমিশন সূত্র দাবি করেছে।
বড় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আসার আহ্বান জানিয়ে সম্প্রতি বিএসইসি চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, তালিকাভুক্ত হলে একটি কোম্পানি করপোরেট ইমেজ পায় এবং তার বাজারমূল্য নির্ধারিত হয়। এই বাজারমূল্য কাজে লাগিয়ে কোম্পানি অন্য প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ বা একীভূত করতে পারে।
পাশাপাশি কোনো অংশীদার ব্যবসা থেকে বের হয়ে যেতে চাইলে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে সহজে বের হওয়ার সুযোগ পান। পারিবারিক ব্যবসার উত্তরাধিকার নিয়েও তিনি কথা বলেন। মাসুদ খান বলেন, প্রজন্ম পরিবর্তনের সঙ্গে অনেক বেসরকারি কোম্পানিতে মালিকদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয় এবং ব্যবসা খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়। তালিকাভুক্ত হলে যেসব অংশীদার ব্যবসায় থাকতে চান না, তাদের জন্য শেয়ার বিক্রি করে বের হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
বড় কোম্পানিকে বাজারে আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তি ও হাইব্রিড পদ্ধতি চালুর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। তার মতে, প্রচলিত আইপিও প্রক্রিয়ায় সময় বেশি লাগে। তাই ভালো কোম্পানিকে দ্রুত বাজারে আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি এমন একটি হাইব্রিড ব্যবস্থা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে কোনো কোম্পানি এক অংশে নতুন মূলধন সংগ্রহ করবে এবং অন্য অংশে বিদ্যমান শেয়ার সরাসরি তালিকাভুক্ত করবে।
আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করতে ‘এক্সটেন্ডেড অডিট’ চালু করছে কমিশন। এ বিষয়ে শুধু আর্থিক বিবরণীর হিসাব ঠিক আছে কি না, তা দেখলেই হবে না; কোম্পানির জমি, যন্ত্রপাতি, মজুতপণ্য, পাওনা ও সরবরাহকারীর তথ্য বাস্তবে সঠিক কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন। এ জন্য আইপিও আবেদনকারী কোম্পানির সম্পদ ও আর্থিক তথ্যের বাস্তবতা যাচাই করে অডিটরদের প্রত্যয়ন করার ব্যবস্থা করা হবে।
এতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) আইপিও যাচাই–প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো মূলত খুচরা বিনিয়োগকারী-নির্ভর। বিএসইসি বাজারকে টেকসই করতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করব করছে। এ জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড ও অন্যান্য তহবিলের অর্থ পুঁজিবাজারের
পাশাপাশি করপোরেট বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হছে। উন্নত দেশের পুঁজিবাজারে পেনশন ফান্ড ও বিমা কোম্পানি বড় বিনিয়োগকারী। বাংলাদেশেও এসব প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীকে বাজারে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। বাজারে স্বাভাবিক লেনদেন ফিরিয়ে আনতে শেয়ারের ওপর আরোপ করা ফ্লোর প্রাইস বা সর্বনিম্ন মূল্যস্তর প্রত্যাহার করা হয়েছে। ২০২২ সালের ২৮ জুলাই বাজারের পতন ঠেকাতে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়েছিল। এতে নির্ধারিত দামের নিচে শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট লেনদেনের সুযোগ ছিল না। দীর্ঘদিন এ ব্যবস্থা বহাল থাকায় অনেক শেয়ারের লেনদেন কমে যায় এবং বাজারে স্থবিরতা তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে অধিকাংশ কোম্পানির ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয়। সর্বশেষ ৯ জুন থেকে সব কোম্পানির ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হয়। এর ফলে শেয়ারের দাম বাজারের চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সূচক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এমএসসিআই বাংলাদেশের বাজার নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থা প্রত্যাহারের পথে গেছে। এমএসসিআই জানিয়েছে, নভেম্বর ২০২৬ থেকে বাংলাদেশের সূচকের নিয়মিত পর্যালোচনা ও করপোরেট ইভেন্ট বাস্তবায়ন আবার শুরু করবে প্রতিষ্ঠানটি।
ফলে পুঁজিবাজারে কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং ও অন্যান্য অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) নজরদারি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এ জন্য বাজারসংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যব্যবস্থার সমন্বয় ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অনিয়মের তথ্য প্রকাশকারীদের বা হুইসেল ব্লোয়ারদের সুরক্ষায় পৃথক বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
শুধু শেয়ারনির্ভর বাজারের পরিবর্তে একটি বহুমাত্রিক পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে করপোরেট বন্ড, সুকুক, গ্রিন বন্ড ও এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড বা ইটিএফ-এর বাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা যুগোপযোগী করার কাজ চলছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে টেকসই বন্ড কাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ড ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পণ্যের বাজার বড় হলে অবকাঠামো ও শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য ব্যাংকনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে পুঁজিবাজার অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি কার্যকর উৎস হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এছাড়া প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আবেদন, বন্ড ও সুকুক অনুমোদন এবং লাইসেন্সিংসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম ধাপে ধাপে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া, বিও হিসাব খোলা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনবোর্ডিং প্রক্রিয়াও আরও সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সময় কমানো, তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে বিএসইসি।
ফলে পুঁজিবাজার সংস্কারের এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল বাজার গড়ে তোলা। সরকারের ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যেও ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, ভালো সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা, হুইসেল ব্লোয়ার সুরক্ষা, পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন ও বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন এবং এআই-ভিত্তিক নজরদারির মতো উদ্যোগের কথা রয়েছে।
তবে বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু নীতিমালা ও প্রযুক্তিগত সংস্কার যথেষ্ট নয়; এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, তার ওপরই পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ আস্থা অনেকাংশে নির্ভর করবে। কারসাজি ও অনিয়মের দ্রুত বিচার, তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুশাসন নিশ্চিত করা, ভালো কোম্পানি বাজারে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ কার্যকরভাবে রক্ষা করা গেলে সংস্কারের সুফল দীর্ঘমেয়াদে দৃশ্যমান হতে পারে। সূত্র: সারাবাংলা



