আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এর ওপর ভর করে কিছুটা গতি ফিরেছিল দেশের পুঁজিবাজারে। তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন বাস্তবে না ঘটায় এখন বাজারে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। টানা দরপতনে গত এক মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান সূচক ৪৮৪ পয়েন্ট কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আস্থার সংকট তীব্র হচ্ছে। আবারও পুঁজি হারানোর আতঙ্ক পেয়ে বসেছে বিনিয়োগকারীদের।

কারণ দীর্ঘদিন ধরে দেশের পুঁজিবাজারে মন্দা চললেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে বাজারে। দীর্ঘ মন্দার প্রভাবে চলতি বছরের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৪ হাজার ৯১০ পয়েন্টে যায়, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে একপর্যায়ে সূচকটি ৫ হাজার ৯০৩ পয়েন্টের ওপরে উঠে আসে। এতে দীর্ঘদিন ধরে বহন করা বিনিয়োগকারীদের বড় লোকসান কিছুটা কমে আসে। তবে সম্প্রতি আবারও বাজারে বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। প্রায় এক মাস ধরে পতনের মধ্যে রয়েছে পুঁজিবাজার।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারে বর্তমান দুর্বলতার পেছনে একাধিক মৌলিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমত ডিএসই-বিএসইসির অযোচিত হস্তক্ষেপ, বিশেষ করে ডিএসইর তদন্ত-চিঠি-ফোন ইস্যুতে পুঁজিবাজারে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, দ্বিতীয়ত জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, তৃতীয়ত উচ্চ সুদহার ও শিল্প-কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়া, চতুর্থত, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফা ও লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা হ্রাস পাওয়া এবং বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ঘাটতি অন্যতম।

তারা বলছেন, পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, বড় বিনিয়োগকারীদের অহেতুক হয়রানি না করা, ভালো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আনা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শিল্প খাতের জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদে অর্থায়নের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় কেবল আশাবাদী বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে বাজারে টেকসই উত্থান ও স্থিতিশীল করা সম্ভব নয়।

তবে গত জুন মাসে পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পেয়েছেন মাসুদ খান। পুঁজিবাজার সংস্কারের নতুন অধ্যায় হিসেবে মাসুদ খানকে মনে করছিলো বাজার সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশের সামগ্রিক কর্পোরেট ইতিহাসে মাসুদ খান এক অনন্য নাম। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশি-বিদেশি বড় বড় কোম্পানিতে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

তবে গত চার মাসের কাছাকাছি বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসাবে মাসুদ খান দায়িত্ব নিলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কতটুকু সফর হয়েছেন এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিনিয়োগকারীসহ বাজার সংশ্লিষ্টদের মাঝে। বরং বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা আবারও ভারী হচ্ছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আবারও বিনিয়োগ করা পুঁজি হারানোর শঙ্কা পেয়ে বসার পাশাপাশি আস্থার সংকটও তৈরি হচ্ছে। ফলে ক্রমান্বয়ে পুঁজিবাজার ডুবতে বসেছে।

স্পর্শকাতর এই খাতটির সঙ্গে লাখ লাখ বিনিয়োগকারীদের সরাসরি বিনিয়োগ জড়িত, প্রতিদিনের লেনদেনের প্রতিফলন ঘটে সূচক উঠা-নামার মাধ্যমে, ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়াটিও সূচকের সমান্তরাল রেখায় প্রতিফলিত হয়। ফলে সূচক ও লেনদেন তলানিতে নামলেও যেন দেখার কেউ নেই। অবশ্য এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান সহ শীর্ষ ব্যক্তিদের খামখেয়ালীপনা, বাজার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব, নানা হঠকারী সিদ্বান্ত, ডিএসই ও বিএসইসির অযোচিত হস্তক্ষেপ, অতিরিক্ত শেয়ার কিনলে ফোন, অহেতুক ব্রোকারেজ হাউজগুলোর তদন্ত সহ নানাবিধ কারণে দেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে ধ্বংসের দারপ্রান্তে।

বিশেষ করে বাজারকে স্থিতিশীল করতে সঠিক পদক্ষেপ না নিয়ে আগের সময়ের ছোট ছোট ভুল ত্রুটিকে সামনে এনে জরিমানা বাজারকে অস্থিতিশীল করা হয়েছে। তবে সবার প্রত্যাশা ছিলো নির্বাচনের পর বাজার স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটবে এমন স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী পুঁজিবাজার কিছু দিন চাঙা থাকলেও ফের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

গত এক মাসের টানা দরপতনে ডিএসইর ৪৮৪ পয়েন্ট সূচকের দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে পুঁজি হারানোর শঙ্কা বইছে। ফলে মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার আগে গত ৩ জুন ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ছিল ৫৪৪২ পয়েন্ট। যা সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসইর) ৯৭ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫৪১৯ পয়েন্টে। অর্থাৎ সূচকটি মাকসুদ খানের রেখে যাওয়ার থেকেও নিচে নেমে গেছে।

এছাড়া পুঁজিবাজার দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে পতনের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। গত ১৬ বছরে পুঁজিবাজার ছেড়েছে প্রায় ১৭ লাখ বিনিয়োগকারী। আর এক দশকের বেশি সময়ে পুঁজিবাজার সংকুচিত হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। বছর পনেরো আগে পুঁজিবাজারে বড় ধসের পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ড. এম খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নতুন কমিশন গঠন করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।

দীর্ঘ ৯ বছর দ্বায়িত্বে থেকেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয় সেই কমিশন। শুধু খায়রুল কমিশন নয়, এরপর বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পাওয়া অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম ও রাশেদ মাকসুদের কমিশনের অধীনে পুঁজিবাজার সংস্কারের অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বিনিয়োগকারীদের মাঝে কাঙ্খিত আস্থা ফেরাতে পারেনি।

এর পর ২০২৬ সালের ৪ জুন মাসুুদ খানের নেতৃত্বে গঠিত বিএসইসির নতুন কমিশন ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার ও কৃত্রিম হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালুর মতো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিলেও আস্থা ফেরাতে পারেনি বিনিয়োগকারীদের। ফলে গত এক মাসে নতুন করে দরপতনে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীদের পুঁজির ৪০ শতাংশ হারিয়েছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, নির্বাচনের পর পুঁজিবাজারে যে সাত-আটশ পয়েন্টের মতো উত্থান হয়েছিল, তার পেছনে তেমন কোনো মৌলিক কারণ ছিল না। নতুন সরকার ও নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, মূলত সেটিই বাজারকে প্রথম দিকে ঊর্ধ্বমুখী করেছিল।

তবে নতুন সরকার ভালো কিছু করবে এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুঁজিবাজারকে ভালো অবস্থানে নিয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা থেকেই বাজারে গতি এসেছিল। কিন্তু শুধু প্রত্যাশার ওপর একটি বাজার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব কাজের প্রতিফলন না থাকলে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা তৈরি হয়।

তিনি আরো বলেন, একজন নিয়ন্ত্রকের কাজ হলো কাজের মাধ্যমে ফল দেখানো, বেশি কথা বলা নয়। নিয়ন্ত্রকের কোনো কথা বলা উচিত নয়। নিয়ন্ত্রক কোনো কথা বলবে না এটাই স্বাভাবিক। অতিরিক্ত বক্তব্য দিলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে? শুরু থেকেই আমি বলে আসছিলাম, পুঁজিবাজারে অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি করা উচিত নয়। অর্থমন্ত্রী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে আশাবাদী বক্তব্য দেওয়ার ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রত্যাশার ওপর ভর করেই বাজার বেড়েছিল। কিন্তু আমি তখনই ধারণা করেছিলাম, এই উত্থান স্থায়ী হবে না। ফলে যা হবার তাই হয়েছে।