আ’লীগ ইস্যুতে বিএনপি-জামায়াতের একই সুর!
বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: রাজনীতির ময়দানে নিজেদের মধ্যে বিরোধ থাকলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনচেষ্টা রুখতে একযোগে মাঠে থাকবে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। এ লক্ষ্যে দুটি দলই ঢাকাসহ সারা দেশে রাজনীতির মাঠে সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করার প্রশ্নে দল দুটি এখন মাঠের প্রস্তুতিতে সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। বছরের শেষ মাসটিতে মাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই এখন তাদের প্রধান এজেন্ডা। যদিও দল দুটি মনে করে, শেখ হাসিনা মূলত রাজনীতিতে আলোচনায় থাকতেই ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন।
দলগুলোর একাধিক সূত্র জানায়, বিএনপির সঙ্গে জামায়াত বা ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বিরোধ যতই দৃশ্যমান হোক না কেন, আওয়ামী লীগের ইস্যুতে তাদের সবার অবস্থান একই। কারণ, তিনটি দলই জানে, আওয়ামী লীগ দেশের রাজনীতিতে ফিরলে তাদের পরিণতি খারাপ হতে পারে। আওয়ামী লীগের ফেরার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বে এনসিপি, এরপর জামায়াত। তখন দল দুটির রাজনীতিতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে, বিএনপিকেও আওয়ামী লীগ কোনোভাবে ছাড় দেবে না। এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রায়ই অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করে থাকেন দলগুলোর নেতাকর্মীরা। তাই রাজনীতিতে যতই বাগবিতণ্ডা হোক, তারা আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার রাজনীতিতে ফেরা ঠেকাতে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চব্বিশের মতো ‘অলিখিত’ এক সমীকরণে ডিসেম্বর মাস জুড়েই রাজপথে সক্রিয় থাকবেন দলগুলোর নেতাকর্মীরা।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের দেশকে অস্থিতিশীল করার ‘অপচেষ্টা’ এবং তাদের ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাস’ মোকাবিলায় রাজপথের কর্মসূচি জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিএনপির হাইকমান্ড। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত মিছিল, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ও গণসংযোগের মতো কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। রাজধানীসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগের ‘সন্ত্রাসী’ কার্যক্রম ঠেকাতে সতর্কতার নামে এলাকায় এলাকায় পাহারার মহড়া শুরু করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। পাশাপাশি কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আরও জোরদার করার জন্য হাইকমান্ড থেকে দলের দায়িত্বশীল নেতাদের বার্তা দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, পরিকল্পিত সন্ত্রাস ও দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টার বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ সমাবেশ করছি। কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি নয়, রাজনৈতিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে করা হচ্ছে। বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন করছে। ধারাবাহিকভাবে চলবে কি না, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে যে কোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা রাজপথে সতর্ক থাকবে। সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা মানুষ হত্যা করেছেন, আদালতের রায়ে তার বিচার হয়েছে। তিনি দেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কর্মসূচির নামে কেউ দেশে অরাজকতা করলে পলাতক ফ্যাসিবাদীরা উৎসাহিত হবে, তারা ফিরে আসার পথ পাবে। বিরোধী দল লংমার্চ করতে পারে; কিন্তু বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচারের পাশাপাশি উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে, কলঙ্কজনক কথাবার্তা বলছে, এতে কারোই লাভ হবে না। এতে স্বৈরাচারের ফিরে আসার পথ আরও সুগম হবে। সেই পথ সুগম হলে কোনো দলই স্বাভাবিক থাকতে পারবে না।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের একাধিক নেতা জানান, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মাঠের
রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় এরই মধ্যে মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এসব কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে ঢাকার শহরের প্রতিটি এলাকায় পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে প্রতিটি জেলা, থানা, উপজেলা ও ইউনিয়নে এ কর্মসূচি পালন করা হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে কর্মসূচি পালনের চিন্তা রয়েছে। বিএনপির পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোও এ কর্মসূচি পালন কবে। তবে বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক কোনো ধরনের কর্মসূচিতে বাধা না দিতে হাইকমান্ড থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, কেন্দ্রীয় নির্দেশনার পর এরই মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ যুবদল, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল রাজধানীতে অগ্নিসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তর বিএনপিও বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রতিবাদ মিছিল কর্মসূচি পালন করেছে। সাংগঠনিক টিম গঠনের মাধ্যমে আরও কয়েকটি প্রতিবাদ সমাবেশ করার কর্মপরিকল্পনা ঠিক করার প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, মহিলা দল প্রতিটি সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আলাদা সাংগঠনিক টিম গঠনের কাজও চলছে। তারা ব্যাপক শোডাউনেরও প্রস্তুতি নিয়েছে। আগামী দুই-তিন মাস ধারাবাহিকভাবে মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি পালন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজকল্যাণবিষয়ক সহসম্পাদক কাজী আবুল বাশার বলেন, দলের হাইকমান্ড কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের পর্যায়ের নেতাকর্মীদের যে কোনো ধরনের অরাজকতার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। জনগণকে সচেতন করতে মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশের মতো কর্মসূচি পালন করছি। পাশাপাশি নিজেদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, আওয়ামী লীগ ডিসেম্বরে আসবে এ ধরনের কিছু দেখছি না। যদি আসে, তখন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা হবে। ঢাকাসহ সারা দেশে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য মোকাবিলা করার জন্য দলীয় কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করা হয়েছে। সরকারের গঠনের পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা কমে গিয়েছিল।
এখন আবার আগের মতোই জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ধারাবাহিকভাবে আমাদের কর্মসূচি চলবে। এরই মধ্যে আওয়ামী অগ্নিসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ডে মানুষকে সোচ্চার করতে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ করার নির্দেশ দিয়েছি। অথচ এখানে সংসদের বিরোধী দলের কোনো ভূমিকা দেখছি না।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব মোস্তফা জামান বলেন, আমরা রাজনীতিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে চাই। আমরা মিছিল-সমাবেশ করার মধ্যে জনগণকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছি। আমরা চাই না আবার দেশে কোনো ধ্বংসযজ্ঞ হোক, মানুষের জানমালের ক্ষতি হোক। দেশের ক্ষতি করার মতো কিছু করার চেষ্টা করলে জনগণকে নিয়ে প্রতিহত করব, ইনশাআল্লাহ। আগামী দুই-তিন সপ্তাহ ঢাকার প্রতিটি ওয়ার্ড ও থানায় ধারাবাহিকভাবে মিছিল-সমাবেশে কর্মসূচি চলবে। দেশ ও জনগণের স্বার্থে প্রয়োজন হলে এ কর্মসূচি ডিসেম্বর পর্যন্ত চলমান থাকতে পারে।
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট: সাত দফা দাবিতে লংমার্চ কর্মসূচির নিয়ে রাজপথে সক্রিয় আছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। জোটটির একাধিক সূত্র জানায়, গত আগস্টে গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ সাত দাবিতে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সারা দেশে লংমার্চ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামে। এর ধারাবাহিকতায় নতুন করে আরও তিনটি বিভাগে লংমার্চ হবে।
এটা ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত চলতে পারে। এখানে ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ শিকার করার টার্গেট তাদের। একদিকে বিএনপিকে চাপে রেখে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন, অন্যদিকে ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সারা দেশের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করা এবং পতিত ফ্যাসিবাদকে একটা বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
আলাপকালে জোটের একাধিক নেতা জানান, জুলাইয়ে শেখ হাসিনা দেশের ফেরার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই দলটির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি তাদের ‘সফট’ বুদ্ধিজীবীরাও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ ফিরে আসার চেষ্টা করলে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলো মিলেই একত্রে তাদের প্রতিহত করা হবে।
তাদের দাবি, আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করার জন্য সরকারের বেশি সদিচ্ছা দরকার। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই একত্রে কাজ করতে হবে। কারণ, আওয়ামী লীগের বিচার না হলে সব পক্ষের ক্ষতি হবে। তাই ভবিষ্যতে কথা বিবেচনায় রেখে বিএনপিকে এগিয়ে আসতে হবে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কথা মূলত রাজনৈতিক কথা। নেতাকর্মীদের মাইন্ড সেটআপ বুঝতে চাচ্ছেন। কিন্তু দেশে ফেরা এত সহজ হবে না। জুলাই অভ্যুত্থানের গণহত্যার দায়ে দেশের ছাত্র-জনতা তাকে ছেড়ে দেবে না। দেশের রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সাধারণ জনগণও তার জন্য অপেক্ষা করে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও আইনিভাবে মোকাবিলার করা হবে। পলাতক আসামি হিসেবে শেখ হাসিনার সাজা হয়েছে। দেশে এসে তাকে আইন অনুযায়ী সাজা ভোগ করতে হবে।
এনসিপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য এবং দলটির মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, আওয়ামী লীগ একটা অবৈধ রাজনৈতিক দল ও সন্ত্রাসীগোষ্ঠী। তারা চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের ১৪শর বেশি মানুষ হত্যা করেছে। আইনগতভাবে তাদের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছি আমরা। ডিসেম্বর আসতে এখনো অনেক সময় বাকি। এখনো সেভাবে সিরিয়াসলি নিইনি। বিরোধী দল হিসেবে আমরা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করব, আইনগতভাবে তাদের মোকাবিলা করা হবে।



