বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: টানা কয়েক দিনের শ্রমিক আন্দোলন ও সংঘাতের পর নারায়ণগঞ্জের পোশাক কারখানাগুলোতে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। শ্রমিকরা কাজে যোগ দেওয়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলেও কাটেনি উদ্বেগ। আন্দোলনের জেরে কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, বাতিল হয়েছে বিদেশি ক্রেতাদের কারখানা পরিদর্শন। এতে দেশের পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন শিল্প মালিকরা। অন্যদিকে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি ঘিরে অসন্তোষের নেপথ্যে উসকানির অভিযোগ তুলছে প্রশাসন। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি শান্ত হলেও পোশাকশিল্পে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় টানা তিন দিনের শ্রমিক আন্দোলন ও সংঘাতের প্রভাব পোশাকশিল্পে পড়বে বলে মনে করছেন মালিকরা। আন্দোলনের কারণে কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সফরও বাতিল হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিল্প মালিকরা।

শিল্প মালিকদের মতে, জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকিং খরচ এবং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির চাপের মধ্যে নতুন করে শ্রমিক অসন্তোষ পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করতে পারে। তবে আর কোনো শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি না হলে হয়ত পুষিয়ে নিতে পারবেন মালিকরা।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। কোথাও কোনো শ্রমিক অসন্তোষ দেখা যায়নি। তবে আন্দোলনের কারণে একেক কারখানা ভেদে ক্ষতির পরিমাণ আলাদা আলাদা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে সব কারখানার ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।

তিনি আরও বলেন, আমার কারখানায় ইংল্যান্ডের একজন নতুন ক্রেতার আসার কথা থাকলেও নিরাপত্তার কারণে তিনি হোটেল থেকে কারখানায় আসেননি। পরদিন আরও কয়েকজন বিদেশি ক্রেতার কারখানা পরিদর্শনের কথা থাকলেও প্রধান কার্যালয় থেকে নিরাপদে থাকার নির্দেশনা পাওয়ায় তারাও আসেননি। কোনো বিশৃঙ্খলা হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট কারখানার নয়, দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করে। বিদেশি ক্রেতারা সরাসরি এমন পরিস্থিতি দেখলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প সম্পর্কে তাদের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে ক্রয়াদেশ কমে যেতে পারে। আমাদের দেশের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। ভবিষ্যতে ক্রেতারা বাংলাদেশকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করবেন। কোনো দেশের ঝুঁকির মাত্রা যত বেশি হয়, সেই দেশে পণ্যের দাম তত কম দেওয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।

নারায়ণগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (৬২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মির্জা মোহাম্মদ আরাফাত বলেন, আমাদের ৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অসন্তোষ এড়াতে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এর আগে বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন চলমান থাকলেও নারায়ণগঞ্জে শান্ত ছিলেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনের নামে শ্রমিকরা ভাঙচুর করাসহ নানা ধরনের বিশৃঙ্খল কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস শ্রমিকরা নীরব ভূমিকায় ছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারাও আর শান্ত থাকেনি। এরপর ৩ নভেম্বর গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে শিবু মার্কেট এলাকায় আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহতও হন। সংঘর্ষের সময় অবরোধে আটকে পড়া বেশ কিছু যানবাহন ভাঙচুর করেন শ্রমিকরা। পরে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এরপর ৪ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এদিন ফতুল্লার শিবু মার্কেট কাঠেরপুল এলাকায় ধাওয়া পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় শ্রমিকরা পাল্টা ইটপাটকেল মারলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরবর্তীতে আরও কয়েকবার শ্রমিকরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হয়। এই ঘটনায় কয়েকজন শ্রমিক আহত হন।

এদিকে এই আন্দোলনের ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরকেই দায়ী করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকদের এই আন্দোলনের পেছনে তাদেরও অংশগ্রহণ ছিল বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে তাদের তৎপরতাকে দায়ী করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি এম এ শাহীন বলেন, আমরা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে মজুরিবোর্ড গঠনের দাবি তুলেছিলাম। এরইমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে। এখন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। মজুরি বোর্ড একটা মজুরি নির্ধারণ করে ঘোষণা করবে। তখন যদি আমাদের মনমতো না হয়, তাহলে আমরা আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা দিতে পারি।

তিনি আরও বলেন, যেহেতু মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে, এখন অপেক্ষা করতে হবে। আজকে বললে কালকেইতো মজুরি ঘোষণা করতে পারবে না। আমরা এই জিনিসটি শ্রমিকদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু তারা সেটা বুঝতেছে না, তাদের মতো করে আন্দোলন করার চেষ্টা করছে। তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততা নেই।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, স্বার্থান্বেষী মহল এখানে উসকানি দিয়েছে। পতিত সরকারের দোসর আছে। সেই দোসরগুলো শ্রমিক সংগঠনের ভেতরে ঢুকে তাদের উসকানি দিয়েছে। এটা বরদাশত করা হবে না। যারা সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করছে, যারা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটাচ্ছে তাদের খুঁজে বের করব। প্রত্যেক জায়গায় ক্যামেরা সেট করা আছে। ড্রোন ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও করা আছে। তাদের খুঁজে বের করে আইনগত ব্যবস্থা নিবো। আমরা সাধারণ শ্রমিকের সঙ্গে আছি। সরকার তাদের বিষয়টি দেখবে।