আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নতুন করে মজুরি বাড়ানোর দাবি ঘিরে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন খাতটির উদ্যোক্তারা। তাদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির চাপের সঙ্গে নতুন করে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়লে রপ্তানি ও ক্রয়াদেশ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ও অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়বে। এমন সংকটে শ্রমিক আন্দোলনের কারণে কারখানা বন্ধ হলে ক্ষতি আরও বাড়বে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পর মজুরি বোর্ড গঠনের কথা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই নতুন মজুরি ঘোষণার দাবি উঠলেও সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়ায় তাতে সম্মতি দিয়েছেন পোশাকশিল্পের মালিকরা। এর মধ্যে কিছু এলাকায় আন্দোলনের নামে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করার ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। এসব ঘটনার পেছনে কোনো তৃতীয়পক্ষের ইন্ধন রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখারও দাবি জানান উদ্যোক্তারা।

তবে সীমিত আয় ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় মজুরি পুনর্র্নিধারণের দাবি জোরালো হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে স্কেল অনুমোদনের পর এবার বেসরকারি খাতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি উঠেছে। তবে উৎপাদন খরচের অনুপাতে পোশাকের দাম না বাড়ায় ব্যবসায়িক চাপে রয়েছেন পোশাকশিল্প মালিকরা। এমন পরিস্থিতিতেও সরকারের মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তে সম্মতি দিয়েছেন তারা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাকের অবদান প্রায় ৮১ শতাংশ। রপ্তানি আয়ে পোশাক খাতের অবদান প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার। আগামীতে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়কে ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এছাড়া পোশাক খাতে রয়েছে বিপুল কর্মসংস্থান। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বড়, মাঝারি ও ছোট মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পোশাক কারখানায় কাজ করেন ৪০ লাখের মতো শ্রমিক। আবার নারীদের আত্মনির্ভরশীলতায় বড় অবদান রাখছে খাতটি। কারণ এই খাতের মোট শ্রমিকের প্রায় ৬২ শতাংশই নারী। তবে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে অন্যসব মানুষের মতোই হিমশিম খাচ্ছেন শ্রমিকরা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ। আগস্টে এটি ছিল ৮.২৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ১১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ৩১ আগস্ট সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে স্কেল অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। পে স্কেলের পর স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি খাতেও বেতন-ভাতা বাড়ানোর চাপ বাড়ছে। ২০১৮ সালের পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো হয়। সে সময় ৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে মজুরি ৪,৫০০ টাকা বা ৫৬.২৫ শতাংশ বাড়ানো হয়।

এদিকে শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে দ্রুত বোর্ড গঠনের আশ্বাস দিয়েছে সরকার। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে। এ ইস্যুতে আন্দোলন করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা শ্রমিক ও মালিকপক্ষ মেনে নেবে না। তৃতীয় কোনো পক্ষ এ বিষয়কে কেন্দ্র করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। গত মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের ৯৬তম এবং তৈরি পোশাক শিল্পবিষয়ক ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের ২৫তম সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেছেন শ্রমমন্ত্রী।

মন্ত্রী জানালেন, মজুরি বোর্ড গঠনের জন্য মালিকপক্ষ তাদের প্রতিনিধি দিয়েছে। শ্রমিকপক্ষকে প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকপক্ষ নাম জমা দেওয়ার দুদিনের মধ্যে বোর্ড গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। ফলে এ বিষয়ে আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

রপ্তানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বললেন, শুধু পোশাকশিল্পের মালিকরা নন, সরকারও শ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে উদ্বিগ্ন। গতকালের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সরকার ও মালিকপক্ষ যখন শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, তখন কার স্বার্থে এবং কারা আন্দোলন করছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এদিকে সরকারের উদ্যোগের মধ্যেই গত মঙ্গলবার গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বেতন বাড়ানোর দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিকরা প্রায় তিন ঘণ্টা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মৌচাক এলাকা অবরোধ করে রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মৌচাক, সফিপুর ও কোনাবাড়ী এলাকার অন্তত ১৫টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন এ তথ্য জানিয়েছেন।

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন বললেন, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত নতুন মজুরি ঘোষণা করা শ্রমিকদের প্রত্যাশা। তবে মজুরি ঘোষণার আগপর্যন্ত শ্রমিকদের ধৈর্য ধরতে হবে। বিক্ষোভের নামে কোনো সংগঠন বা গোষ্ঠী কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য করলে এর দায় তাদের নিতে হবে।