পুঁজিবাজারে বন্ডের লেনদেন বাড়াত বিএসইসির নয়া উদ্যোগ
বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে বন্ডের লেনদেন বাড়ানো এবং বেসরকারি খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গত পাঁচ মাসে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বন্ড অনুমোদনের পাশাপাশি বন্ড বাজারকে সক্রিয় করতে একাধিক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। বিএসইসির এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, পুঁজিবাজারের পাশাপাশি বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা এবং করপোরেট বন্ডের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পথ সম্প্রসারণ করা। এ জন্য অনুমোদিত বন্ড স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত করা ও তালিকাভুক্তি ফি কমানো এবং বন্ড ইস্যুর প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, বন্ড বাজারকে গতিশীল করতে এবারই প্রথম মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তির শর্ত দেওয়া হয়েছে। এতে বন্ডগুলো স্টক এক্সচেঞ্জের দ্বিতীয় বাজারে লেনদেনের সুযোগ পাবে। এ জন্য তালিকাভুক্তি ফি কমানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বন্ড মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত হলে বিনিয়োগকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী তা বিক্রি করে সহজে বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন। এতে বন্ডের কার্যকর বাজার গড়ে তোলার পাশাপাশি লেনদেন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
গত পাঁচ মাসে বিএসইসির অনুমোদন পাওয়া বন্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে: ব্র্যাক ব্যাংকের ১ হাজার কোটি টাকার তিন বছর মেয়াদি জিরো-কুপন গ্রিন বন্ড, সাউথইস্ট ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড, ব্যাংক এশিয়ার ৮০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাসটেইনেবল সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড এবং ওয়ান ব্যাংকের ৪০০ কোটি টাকার সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড। এ ছাড়া নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের লক্ষ্যে সাজেদা ফাউন্ডেশনের ১৫৮ কোটি টাকার ‘অরেঞ্জ বন্ড’ অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। পরিবেশ সুরক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও নারী ক্ষমতায়নের মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে থিমেটিক ও সামাজিক বন্ড চালুর উদ্যোগের অংশ এটি।
ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রিন বন্ড পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগে অর্থায়ন এবং টিয়ার-২ মূলধন সংগ্রহে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে করপোরেট বন্ডের ধরন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বন্ড বাজারের পরিধি বাড়াতে বড় প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগও নিয়েছে বিএসইসি। বর্তমানে বিভিন্ন প্রভিডেন্ট ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডের অর্থের বড় অংশ সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়। এসব তহবিলের অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ যাতে করপোরেট বন্ড ও শেয়ারে বিনিয়োগ করা যায়, সে লক্ষ্যে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।
বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, দেশের বড় প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলগুলোকে করপোরেট বন্ড বাজারে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি অর্থের নতুন উৎস তৈরি হবে। একই সঙ্গে করপোরেট বন্ডের চাহিদা বাড়বে এবং বেসরকারি খাতের জন্য বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে। বন্ড বাজারে বীমা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে কমিশন।
বিশেষ করে মিউচুয়াল ফান্ডের নির্দিষ্ট আয়ভিত্তিক তহবিল এবং বীমা কোম্পানির অর্থ যাতে করপোরেট বন্ডে আরও বেশি বিনিয়োগ করা যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বন্ড কেনাবেচার জন্য পৃথক লেনদেন প্ল্যাটফর্মকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের বন্ড কেনাবেচার সুযোগ বাড়বে এবং দ্বিতীয় বাজারে লেনদেন সম্প্রসারণ সহজ হবে।
বন্ড ইস্যুর প্রক্রিয়া সহজ ও সময়োপযোগী করতে বিদ্যমান আইনি কাঠামো আধুনিক করার কাজও চলছে। এ লক্ষ্যে ডেট ইস্যু রুলস সংশোধন ও সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। নতুন বিধিমালায় বন্ড অনুমোদন ও ইস্যুর প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিএসইসির মতে, পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ারনির্ভর না রেখে শেয়ার, বন্ড ও অন্যান্য আর্থিক পণ্যের সমন্বয়ে বহুমাত্রিক বাজার হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে করপোরেট বন্ড বাজারের বিকাশকে সংস্কার কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়তে পারে।
পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ারের পাশাপাশি তুলনামূলক স্থির আয়ের বিনিয়োগ পণ্য বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। বন্ডের দ্বিতীয় বাজার সক্রিয় হলে পুঁজিবাজারে লেনদেনের পরিধি ও বাজারের গভীরতা বাড়াতেও তা সহায়ক হতে পারে।



