শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এর ওপর ভর করে কিছুটা গতি ফিরেছিল দেশের পুঁজিবাজারে। তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন বাস্তবে না ঘটায় এখন বাজারে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। আগস্টের মাঝামাঝি থেকে টানা দরপতনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান সূচক ৪৭১ পয়েন্টের বেশি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আস্থার সংকট তীব্র হচ্ছে। আবারও পুঁজি হারানোর আতঙ্ক পেয়ে বসেছে বিনিয়োগকারীদের। কারণ আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকেই সূচক টানা নিম্নমুখী ছিল। ফলে ১১ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচক ৫ হাজার ৯০৩ পয়েন্টের ওপরে থাকলেও ২৫ অক্টোবর এসে দাঁিড়য়েছে ৫ হাজার ৪৩২ পয়েন্ট।

মুলত পুঁজিবাজারে শেয়ার কেনাবেচা ও অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তকরণ এবং বাজার তদারকির নামে অতিরিক্ত নজরদারির ভয়ে বড় বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শেয়ারদর বাড়লেই তদন্ত কমিটি গঠন ও লেনদেনের ব্যাখ্যা চেয়ে প্রতিবেদন পাঠানো এবং জরিমানার নোটিশ দেওয়ার মতো পদক্ষেপে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে লেনদেনের পেছনের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান না করেই সন্দেহের ভিত্তিতে প্রতিবেদন পাঠানো হচ্ছে। এতে বাজারে সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগের পরিবর্তে সতর্ক ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন বড় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ।

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নজরদারি ও তদন্তপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যার ঘাটতি রয়েছে। শেয়ারদর বাড়লে কারসাজির সন্দেহে তদন্ত ও কমিটি গঠনের তৎপরতা দেখা গেলেও দরপতনের ক্ষেত্রে একই ধরনের সক্রিয়তা সব সময় চোখে পড়ে না।

এছাড়া পুঁজিবাজারে কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম চলছে। জুন ক্লোজিংয়ের প্রায় তিন শতাধিক কোম্পানির মধ্যে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। চলতি সপ্তাহেও প্রায় ২০০টি কোম্পানির লভ্যাংশ ঘোষণার কথা রয়েছে। তবে লভ্যাংশ ঘোষণাকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা থাকলেও বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। বরং সূচকের পতন ও লেনদেন কমে যাওয়া এবং অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর হ্রাসের কারণে হতাশা বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের দরপতনে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট আরও গভীর হচ্ছে। বাজারের উন্নয়ন ও সংস্কারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও চলমান অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে। তাদের মতে, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে যথাযথ নজরদারি ও কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।

তারা মনে করছেন, লভ্যাংশ ঘোষণা করলেই পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা ফিরবে এমন নয়। কোম্পানির আর্থিক অবস্থান, মুনাফা ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এবং সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতিও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। ফলে লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুমেও বাজারে দরপতন অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।

অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুমেও যদি বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি না হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের হতাশা আরও বাড়তে পারে। তাই বাজারের অস্থিরতা কমাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর পদক্ষেপ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

ফলে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় দরপতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। মুলত বেশিরভাগ ব্যাংকের শেয়ার দাম বাড়ার পরও দরপতন থেকে রক্ষা পায়নি পুঁজিবাজার। তবে ব্যাংকের কল্যাণে সূচকের বড় পতন ঠেকানো গেলেও লেনদেনের গতি কমে গেছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৮ দশমিক ৭ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৪৩২ দশমিক ৫৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসইএস ৯ দশমিক ৭১ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৬০ দশমিক ৬৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর ডিএসই-৩০ সূচক ১ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১০১ দশমিক ৭৩ পয়েন্টে।

দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৮৫ কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৬৪ টির, দর কমেছে ২৮৩ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৩৮ টির। ডিএসইতে ৪৩০ কোটি ৭২ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৭১ কোটি ৯১ লাখ টাকা বেশি। এর আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫০২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) ১৬ কোটি ১২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে বাজারটিতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ৫ কোটি ৫ লাখ টাকা।

এদিন সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৬৩টি কোম্পানির মধ্যে ৫৯টির শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে, ৮৬টির কমেছে এবং ১৮টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ২২ দশমিক ৪৯ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৫৮১ দশমিক ৪২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এর আগের কার্যদিবসে সূচকটি ৬৬ দশমিক ৮১ পয়েন্ট বেড়েছিল।