ছয় জীবন বিমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক ঝুঁকিতে গ্রাহকরা
মেহেদী হাসান, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের বিমা খাতে চরম আর্থিক বিশৃঙ্খলা ও আস্থার সংকট নজিরবিহীন রূপ নিয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশের ছয়টি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ‘লাইফ ফান্ড’ বা জীবন তহবিল ঋণাত্মক (নেগেটিভ) পর্যায়ে নেমে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও আশঙ্কাজনক সংকটে পড়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে বিমা খাতের এই দেউলিয়া ও ভঙ্গুর চিত্র উঠে এসেছে।
বিমা খাতের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ‘লাইফ ফান্ড’ হলো গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রিমিয়ামের সেই সংরক্ষিত অংশ, যা দিয়ে ভবিষ্যতে গ্রাহকের বিমা দাবির টাকা মেটানো হয়। কোনো কোম্পানির লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো: প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক মূলভিত্তি চরম ঝুঁকিতে পড়েছে এবং মেয়াদ শেষে গ্রাহকের পাওনা টাকা পরিশোধ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ বা সম্পদ তাদের হাতে নেই।
ফলে ছয়টি জীবন বীমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ১২০ কোটি ৬ লাখ টাকা। অন্য পাঁচটি কোম্পানি হলো পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্স, বায়রা লাইফ ইন্সুরেন্স, শান্তা লাইফ ইন্সুরেন্স, গোল্ডেন লাইফ ইন্সুরেন্স ও যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা ইসলামী লাইফের ঋণাত্মক লাইফ ফান্ড ৩২৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। বায়রা লাইফ ইন্সুরেন্সের ৫৮ কোটি ১৭ লাখ, শান্তা লাইফ ইন্সুরেন্সের ১৯ কোটি ৮৫ লাখ, গোল্ডেন লাইফ ইন্সুরেন্সের ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা এবং যমুনা লাইফ ইন্সুরেন্সের ৯৪ লাখ টাকা।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে জীবন বীমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের অনিষ্পন্ন দাবিই ছিল প্রায় ৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকা খাতের মোট অনিষ্পন্ন দাবির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। অর্থাৎ কোম্পানিটির আর্থিক সংকটের প্রভাব সরাসরি বিপুলসংখ্যক পলিসিধারীর ওপর পড়ছে।
দাবি পরিশোধে গতি আনতে আইডিআরএ বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। গত ৪ অক্টোবর তৃতীয় ধাপে ছয়টি জীবন বীমা কোম্পানির ৭ হাজার ৬৪১ জন পলিসিধারীকে ২৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এর আগে দুই ধাপে ৮ হাজার ৪১৭ জনকে দেওয়া হয়েছিল ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
তিন ধাপ মিলিয়ে ১৬ হাজার ৫৮ জন পলিসিধারী পেয়েছেন প্রায় ৬৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। তবে খাতের হাজার হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন দাবির তুলনায় এই অর্থ খুবই সামান্য। ফলে শুধু ধাপে ধাপে দাবি পরিশোধ নয়, কোম্পানিগুলোর আর্থিক দুর্বলতার কারণ শনাক্ত করা, সম্পদ ও দায়ের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ এবং দাবি নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণও জরুরি।



