বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনাকে ঘিরে তৎপরতা শুরু করেছেন দলটির বিদেশে অবস্থানরত নেতারা। পশ্চিমা বিভিন্ন দেশে থাকা আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ভারত, বিশেষ করে কলকাতায় ফিরতে শুরু করেছেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফেরার প্রত্যাশায় সেখানে জড়ো হচ্ছেন তারা। এ ছাড়া বিদেশে অবস্থানরত আরও অনেক নেতা-কর্মীও তার ফেরার দিন বাংলাদেশে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কলকাতায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর দুই সদস্য, একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দুই সাংগঠনিক সম্পাদক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে জানিয়েছে টাইমস অব বাংলাদেশ।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আবারও ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর হতে পারে। তবে এমন পরিণতির আশঙ্কা থাকলেও দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে তিনি অনড় বলে জানিয়েছেন। দেশে ফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভারত কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাইবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, কোনো বিদেশি শক্তির কাছে তিনি সহায়তা চাননি। গ্রেপ্তার কিংবা মৃত্যুদণ্ড যে পরিণতিই আসুক, তা মেনে নিতে প্রস্তুত রয়েছেন তিনি।

আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নভেম্বরের মাঝামাঝি অথবা মাসের শেষ দিকে পশ্চিমা গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের নিয়ে ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলন করতে পারেন শেখ হাসিনা। লন্ডন থেকে ওই সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত হয়ে দেশে ফেরার তারিখ ও পরিকল্পনার বিস্তারিত জানাতে পারেন তিনি। এ ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

লন্ডনে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের এক নেতা জানিয়েছেন, সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি শেষ হলে আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে। পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ থেকে সম্প্রতি কলকাতায় যাওয়া আওয়ামী লীগের নেতারা সেখানে আগে থেকে অবস্থানরত জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন। পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হচ্ছে একাধিক সাংগঠনিক সভা।

এসব বৈঠকে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জাহাঙ্গীর কবির, এ কে এম মোজাম্মেল হক ও মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী ; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাছিম; সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল; মির্জা আজম; সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী, সুজিত রায় নন্দী এবং কেন্দ্রীয় নেতা শেখ হেলাল উদ্দিন অংশ নিচ্ছেন। এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য মৃণাল কান্তি দাস, অসীম কুমার উকিল, আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম ও নিজাম উদ্দিন হাজারীও এসব বৈঠকে রয়েছেন। বৈঠকগুলোতে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি কলকাতায় পৌঁছেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান, সাবেক মন্ত্রী ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান এবং ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত সিকদার। আবদুর রহমান বলেন, সবাই সেখানে অবস্থান করছেন। নেত্রীর দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিদেশে থাকা কয়েক হাজার নেতাকর্মী একসঙ্গে দেশে ফেরার জন্য প্রস্তুত। সবাই শেখ হাসিনার ঘোষণার অপেক্ষায় আছেন। শামীম ওসমান বলেন, দেশের মানুষ শেখ হাসিনাকে চায় এবং তার ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে। হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থককে সঙ্গে নিয়ে তিনি দেশে ফিরবেন। সবাই এক জায়গায় আসছেন এবং এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারাও কলকাতায় অবস্থান করছেন। সেখানে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোতে যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান ন অংশ নিচ্ছেন। এ ছাড়া ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানও এসব তৎপরতায় যুক্ত রয়েছেন। দলীয় কর্মসূচি এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাও কলকাতায় অবস্থান করছেন।

আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা বর্তমানে বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। সাবেক মন্ত্রী এস এম রেজাউল করিম লন্ডন ও কলকাতার মধ্যে যাতায়াত করছেন। সাবেক মন্ত্রী এনামুল হক শামীম, সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম , কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম এবং সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে।

দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ অবস্থান করছেন লন্ডনে। হাসান মাহমুদ চৌধুরী রয়েছেন বেলজিয়ামে এবং নসরুল হামিদ বিপু থাইল্যান্ডে। দলীয় সূত্রের দাবি, তারাও যেকোনো সময় কলকাতায় ফিরতে পারেন। এর আগে নেপালে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতারা বিভিন্ন সমস্যার কারণে সেখান থেকে ভারতসহ অন্যান্য দেশে চলে যান। তাদেরও কলকাতা হয়ে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সরকারের একটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, সরকার শেখ হাসিনাকে পাসপোর্ট কিংবা ট্রাভেল পাস দেবে না। ফলে এসব নথি ছাড়া তিনি কীভাবে দেশে ফিরবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করছেন, দেশে ফেরার বিকল্প ব্যবস্থা তাদের হাতে রয়েছে। যদিও সেই ব্যবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি তারা।

লন্ডনে অবস্থানরত সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাস না দিলেও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। তার দেশে ফেরার পথে বাধা দেওয়া হলে সরকার অস্তিত্ব সংকটে পড়বে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

বিদেশে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অনেকেও কলকাতায় অবস্থান করছেন। দলটির কয়েক শ নেতা-কর্মী ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ফিরেছেন। তারা প্রকাশ্যে না এসে গোপনে সাংগঠনিক তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। নিজ নিজ এলাকার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ রেখে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দিচ্ছেন তারা।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের শেখ হাসিনার দেশে ফেরার দিন একযোগে রাজপথে নামার নির্দেশ দিয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে এ কর্মসূচির বিস্তারিত পরিকল্পনা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। জেলা পর্যায়ের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা নিজেই এ বিষয়ে বিস্তারিত ঘোষণা দেবেন।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সদস্যরা অনলাইনে সক্রিয় রয়েছেন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা, পুলিশের ওপর হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ এবং পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।