দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের গ্রাহকদের শত শত কোটি টাকার আমানত হুমকির পড়েছে। কারণ রূপালি লাইফ ইন্স্যুরেন্স থেকে প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সে ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) করা হয়ছে। যা আদায় নিয়ে উচ্চ শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক। এছাড়া এই কোম্পানিটি থেকে অর্ধ যুগের বেশি আগে হসপিটাল নির্মাণের আগে অগ্রিম কয়েক কোটি টাকা দিয়ে রাখলেও তার কোন উন্নতি নাই। কোম্পানিটির সর্বশেষ ২০২৪ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাবে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন, ২ কোটি ২১ লাখ টাকা এফডিআর ২০১৯ সালের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। রূপালী লাইফ ওই সময় লিজিং কোম্পানিকে লিখিত চিঠি পাঠিয়েছিল, কিন্তু প্রতিউত্তর পাওয়া যায়নি। এরপর ২০২৪ সালের ১৩ নভেম্বর পুনরায় চিঠি পাঠানো হয়, তাতেও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।

প্রিমিয়ার লিজিং কর্তৃপক্ষ রূপালি লাইফের মতো অন্যদেরও মেয়াদ পূর্ণ করা এফডিআর এর অর্থ দিচ্ছে না। অর্থাৎ লিজিং কোম্পানিটির অবস্থা অবস্থা খুবই শোচণীয়। ফলে এফডিআর আদায় নিয়ে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে রূপালি লাইফ। তারপরেও সম্ভাব্য লোকসানের বিপরীতে সঞ্চিতি গঠন করেনি রূপালি লাইফ কর্তৃপক্ষ।

এই বীমা কোম্পানিটি থেকে রূপালি লাইফ হসপিটাল কোম্পানি গঠনের জন্য ২০১৮ সালে অগ্রিম ৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা দিয়ে রেখেছে। অথচ ওই হসপিটালের জন্য এখনো কোম্পানি গঠন করা হয়নি। এছাড়া রাজুক হসপিটাল নির্মাণে জমির অনুমোদন দেয়নি।

এদিকে বীমা কোম্পানি কর্তৃপক্ষ আর্থিক হিসাবে কোম্পানির কাছে (ব্যাংক ছাড়া) নগদ ১৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ছিল বলে জানিয়েছে। তবে এরমধ্যে ৩১ লাখ টাকা দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়ে আসছে। যার কোন সমন্বয় হয়নি। রূপালি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষ আয়কর গণনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।

জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে এজেন্টদের কাছে পাওনা হিসেবে ২৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা দেখিয়ে আসছে কোম্পানিটি। তবে নিরীক্ষক মনে করেন, ওই অর্থ আদায়যোগ্য নয়। এরপরও সম্ভাব্য লোকসানের বিপরীতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী কোনো সঞ্চিতি গঠন করা হয়নি। নিরীক্ষক আরও উল্লেখ করেন, কোম্পানির দেখানো বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৬৫ লাখ টাকা থাকলেও সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিস্কিয় (ডরমেন্ট)। যাচাই-বাছাই শেষে সেখানে প্রকৃত অর্থ পাওয়া গেছে মাত্র ৩০ লাখ টাকা। ফলে অতিরিক্ত সম্পদ হিসেবে দেখানো হয়েছে ৩৫ লাখ টাকার বেশি।

এছাড়া রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তিনি অনিয়মকে নিয়ম বলে চালিয়ে যাচ্ছেন। কোন কিছু তোয়াক্কা করছেন না। তার অনিয়মগুলো যেন নিয়মে পরিনত হয়েছে। ফলে জাল-জালিয়াতি, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে।

এর মধ্যে আইন লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়মের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। গোলাম কিবরিয়া অনিয়ম ও অনৈতিক পন্থায় অত্যন্ত সুক্ষ্ম এবং সুপরিকল্পিতভাবে আত্মসাত করেছেন কোম্পানির কোটি কোটি টাকা। যার ফলে হুমকির মুখে পড়েছে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ১২ লাখ গ্রাহকের শত শত কোটি টাকার আমানত।

এর ফলে নানান সমস্যায় বিপদগ্রস্ত রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক হিসাবে বড় ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রায় ৬৯ কোটি টাকার গরমিলের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন নিরীক্ষক। কোম্পানিটির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর কোম্পানিটি ব্যাংক বুক/লেজারে নগদ অর্থ দেখিয়েছে ৯১ কোটি ৫১ লাখ টাকা। তবে ব্যাংক স্টেটমেন্টে পাওয়া গেছে মাত্র ৪৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

অর্থাৎ কোম্পানির হিসাবে ব্যাংক ব্যালেন্সের সঙ্গে প্রকৃত স্টেটমেন্টের পার্থক্য দাঁড়িয়েছে ৪৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
এ ছাড়া রূপালী লাইফ থেকে কর্মীদের অগ্রিম বেতন, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল ও মোবাইল কেনার জন্য প্রায় ২১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব অগ্রিম অর্থ বছরের পর বছর একই অবস্থায় আছে, কোনো সমন্বয় করা হয়নি। কোম্পানিটির সম্ভাব্য লোকসানের বিপরীতে এখানেও সঞ্চিতি রাখা হয়নি।

তবে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মো. কামরুজ্জামান নামের এক কর্মীর কাছে দেওয়া ৬ লাখ টাকার অগ্রিম বেতন আদায়ে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ২০০৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি ১ লাখ টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালক ব্যতীত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে আছে ৬৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ শেয়ার।