দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাংলাদেশের বীমা খাতকে দীর্ঘদিন ধরেই ‘আস্থার সংকটে থাকা খাত’ হিসেবে দেখা হয়। এই সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতা ও নীতিগত ব্যর্থতাই ধীরে ধীরে এ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ফলে সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানো আজও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। এই প্রেক্ষাপটে বীমা খাতের বাস্তব চিত্র ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন মামুন রশীদ। তিনি দেশের একজন প্রথিতযশা ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক। প্রায় চার দশক ধরে দেশ ও বিদেশে ব্যাংকিং, পুঁজিবাজার, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাত সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।

২০০৭-০৮ সালে বীমা খাতের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মামুন রশীদ। পরে ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বীমা খাত উন্নয়ন প্রকল্পে লিড কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন। এই সময়ে তিনি খাতটির নীতি, কাঠামো ও কার্যকারিতা নিয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ পান।

বর্তমানে তিনি ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেড এবং বিডি ভেঞ্চারের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বীমা খাতের নানা সমস্যা, সম্ভাবনা ও সংস্কার উদ্যোগ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন তিনি। বাংলাদেশে ইন্স্যুরেন্স বা বীমা খাতকে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ‘আস্থার সংকটে থাকা খাত’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। আপনার দৃষ্টিতে এ আস্থাহীনতার মূল কারণগুলো কী কী বলে আপনি মনে করেন?

বাংলাদেশে বীমা খাতকে দীর্ঘদিন ধরে ‘আস্থার সংকটে থাকা খাত’ বলা হয়। এটি হঠাৎ তৈরি হয়নি, বরং বছরের পর বছর ধরে সঞ্চিত কিছু কাঠামোগত ও নীতিগত ব্যর্থতার ফল। আমার দৃষ্টিতে এ আস্থাহীনতার মূল কারণ শুরু হয় ক্লেইম ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা থেকে। একজন গ্রাহক যখন নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ করার পরও যৌক্তিক সময়ে ক্লেইমের টাকাটা পান না, তখন সেটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়, পুরো খাতের ওপর আঘাত করে।

দ্বিতীয়ত, করপোরেট গভর্ন্যান্সের ঘাটতি এ সংকটকে আরো গভীর করেছে। অনেক ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে পেশাদারত্বের অভাব, স্বার্থসংঘাত ও স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার চেয়ে স্বল্পমেয়াদি ব্যবসায়িক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহকের ক্ষতি ডেকে আনে।

তৃতীয়ত, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বল প্রয়োগ একটি বড় কারণ। আইন ও বিধিমালা থাকলেও তার বাস্তবায়ন যথেষ্ট কঠোর নয়। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ধীর ও অনিয়মিত হওয়ায় বাজারে শৃঙ্খলা তৈরি হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এজেন্টনির্ভর বিক্রয় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃত শর্ত না বুঝিয়েই পলিসি বিক্রি করা হয়।

পরিশেষে বলতে হয়, বীমা খাতকে এখনো নীতিগতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ দুর্বল। যতদিন না গ্রাহক সুরক্ষা, শক্ত নিয়ন্ত্রণ ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে নিশ্চিত করা যাবে, ততদিন এ আস্থার সংকট কাটানো কঠিনই থেকে যাবে।