নতুন এমপিদের বরণে প্রস্তুত জাতীয় সংসদ ভবন, অপেক্ষা সরকার গঠনের
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বঙ্গভবনে নতুন সরকার প্রধান ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়াতেন রাষ্ট্রপতি। স্বাধীনতার পর সব সময় এমন প্রথা অনুসরণ করা হয়েছে। কিন্তু এবারই প্রথম সেই রীতি ভেঙে শপথ অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়।
মঙ্গলবার সকাল ১০টায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ এবং বিকেল ৪টায় নতুন মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই প্রাঙ্গণে। তবে শপথের স্থান বদল হলেও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। যথারীতি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
বঙ্গভবনের পরিবর্তে সংসদ ভবন এলাকায় শপথের আয়োজনের কারণ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী বিএনপির অভিপ্রায়ে সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে শপথের আয়োজন করা হচ্ছে। জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলন, জুলাই সনদ ঘোষণাসহ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ নতুন তাৎপর্য পেয়েছে।
ফলে দক্ষিণ প্লাজায় শপথ আয়োজন প্রতীকী দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের বিষয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, কনভেনশন অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আমন্ত্রণের বিষয়টি দেখছে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সার্কভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
শপথ অনুষ্ঠানে ভারত, পাকিস্তান, চীনসহ ১৩ দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তালিকায় রয়েছে সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ ও ভুটান। দক্ষিণ এশিয়া ও মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো কূটনৈতিক ভারসাম্যের বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সংবিধানের ১৪৮ (২ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) গত শুক্রবার রাতে ২৯৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৭টিতে বিজয়ীদের গেজেট প্রকাশ করে। আর উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় চট্টগ্রাম-২ ও ৪ আসনের ফলাফল স্থগিত রেখেছে সংস্থাটি।
সংসদ ভবনের সামনের দক্ষিণ প্লাজায় আজ সকাল ১০টায় নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতির প্রেক্ষাপটে এবার সিইসি তাদের শপথ পড়ানোর দায়িত্ব পাচ্ছেন।
মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান এবং নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেবেন। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মন্ত্রিসভায় সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ টেকনোক্র্যাট হিসেবে থাকতে পারবেন। শপথের পরপরই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দপ্তর বণ্টনের প্রজ্ঞাপন জারি করবে। নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিলে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে।
এদিকে নতুন আইনপ্রণেতাদের শপথ গ্রহণ এবং তাদের বরণ করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে সংসদ ভবন সচিবালয়। সংসদের সচিব কানিজ মওলা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার ঘটনার সময় ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামত করা হয়েছে। শপথ অনুষ্ঠানের জন্য সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অস্থায়ী মঞ্চ, অতিথি গ্যালারি, ভিভিআইপি জোন ও গণমাধ্যম কর্নার প্রস্তুত।
অনুষ্ঠানস্থল ঘিরে বহুস্তরের নিরাপত্তা বলয়, আলাদা প্রবেশপথ, গণমাধ্যমগুলোর সরাসরি সম্প্রচার এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সংসদের শপথ কক্ষ, অধিবেশন কক্ষ, স্পিকার ও রাষ্ট্রপতির অফিস কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। এমপি হোস্টেলসহ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতেও শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে।
শপথের পরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ জানিয়েছেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল তাদের নিজস্ব সংসদ সদস্যদের নেতা নির্বাচন করবেন। যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের নেতা নির্বাচিত হবেন, তিনি রাষ্ট্রপতিকে জানাবেন যে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের নেতা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বহনে পরিবহন পুলের ৪৫টি গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা, আলোকসজ্জা ও অবকাঠামোগত সংস্কার শেষ পর্যায়ে। এবার দুই দশক পর সরকার গঠনে যাচ্ছে বিএনপি। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেন শিরীন শারমিন চৌধুরী।
তিনি মামলার আসামি হয়ে বর্তমানে প্রকাশ্যে নেই। তার সঙ্গে ডেপুটি স্পিকার ছিলেন অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু। তিনিও মামলার আসামি হয়ে কারাগারে আছেন। ফলে নতুন সংসদ সদস্যদের কে শপথ পড়াবেন, তা নিয়ে একধরনের জটিলতা তৈরি হয়।
সংবিধান অনুযায়ী, শপথবাক্য পাঠ করানোর কথা স্পিকার, তার মনোনীত কোনো ব্যক্তি বা ডেপুটি স্পিকারের। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সময় থেকেই স্পিকার নিখোঁজ। ডেপুটি স্পিকার কারাগারে। ফলে সংবিধান মেনে নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের পর তিন দিন অপেক্ষা করে শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ : বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গত রোববার একটি কূটনৈতিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের পক্ষ থেকে কে প্রতিনিধিত্ব করবেন, সে বিষয় নিয়ে কাজ করছে দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন।
সূত্র জানায়, ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরলা এবং দেশটির পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি ঢাকায় আসতে পারেন। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। জানা গেছে, গতকাল সোমবার থেকে নয়াদিল্লিতে পাঁচ দিনব্যাপী ‘ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট-২০২৬’ শুরু হচ্ছে। সামিটে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁসহ প্রায় ২০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানকে আতিথেয়তা দেবে ভারত। এ কারণে মোদি ঢাকায় আসছেন না।



