স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানি সাউথইস্ট ব্যাংকে জালিয়াতির মাধ্যমে বিতরণ করা বড় অঙ্কের সব ঋণই এখন খেলাপি হচ্ছে। এ কারণে অপরিশোধিত ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। ফলে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে। মুলত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে। এরই মধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসি’র ২ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের প্রায় ৭১ শতাংশই ১০টি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের পকেটে। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ১ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা।

ফলে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকে রাখা আমানতকারীদের টাকা যেমন আত্মসাৎ করা হয়েছে, তেমনি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। পাচার করা টাকায় বিদেশে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিলাসবহুল প্রতিষ্ঠান। পাচারের টাকায় জালিয়াতরা এখন দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল জীবন যাপন করছেন। যার ফলে সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসি’র ঋণ খেলাপি বাড়ায় ব্যাংকটির আমানতকারীরা পড়েছেন ঝুঁকিতে। নতুন করে ব্যাংকটিতে আমানত রাখতেও ভয় পাচ্ছেন তারা।

শুধু তাই নয়, সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর কবির ও পরিচালনা পর্ষদের ছত্রছায়ায় অনিয়মমাফিক ঋণ দেওয়ার কারণে ঋণ খেলাপির পরিমাণও বেড়েছে। মুলত দুইজনের কাছে জিম্মি ছিলো সাউথইস্ট ব্যাংক। একজন খোদ সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর কবির। অপরজন পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত। তাদের দুজনের বিরুদ্ধেই রয়েছে আর্থিক দুর্নীতি, ঋণ জালিয়াতি, পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারি ও অর্থপাচারসহ নানা অভিযোগ।

এছাড়া সাউথইস্ট ব্যাংকের পিছু ছাড়ছে না খেলাপি ঋণের বোঝা। বিশেষ করে মুষ্টিমেয় কয়েকজন বড় গ্রাহকের কাছে ঋণের বিশাল অংশ আটকে যাওয়ায় ব্যাংকটির আর্থিক ভিত ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকটির মোট ২ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের প্রায় ৭১ শতাংশই ১০টি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের পকেটে। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ১ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা।

ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রভাবশালী এসব গ্রাহকের থেকে টাকা আদায় করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। শীর্ষ খেলাপিদের কেউ এখন কারাবন্দী, কেউবা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। ফলে বিপুল পরিমাণ এই অর্থ আদায় নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

শীর্ষ ১০ খেলাপির তালিকায় সবার ওপরে আছে কেয়া গ্রুপ ও এস আলম গ্রুপ। এই দুই প্রতিষ্ঠানের কাছেই ব্যাংকটির পাওনা প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। একসময় সাবান ও প্রসাধন সামগ্রীর ব্যবসায় সফল হওয়া কেয়া গ্রুপ গার্মেন্টস খাতে বিনিয়োগ করে বড় ধাক্কা খায়। বর্তমানে তাদের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪৯৮ কোটি টাকা।

অভিযোগ আছে, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই কেয়া গ্রুপকে এসব ঋণ দেওয়া হয়েছিল। ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ইতিমধ্যে কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল খালেক পাঠানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪৭৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া ফার সিরামিকসের ৩৩৮ কোটি ও পদ্মা পলি কটনের ১৭১ কোটি টাকাসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বড় অংকের ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে।

সাউথইস্ট ব্যাংকের ঋণের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যাংকটির সিংহভাগ ঋণই গুটিকয়েক বড় গ্রুপের হাতে বন্দি। মোট ৩৭ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৫৭ শতাংশেরও বেশি টাকা নিয়েছেন মাত্র ২০ জন গ্রাহক।

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে সাউথইস্ট ব্যাংকের ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ ২০ গ্রুপের ঋণ ২১ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ৫৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতার কাছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপের। ব্যাংকটিতে বসুন্ধরা গ্রুপের ঋণ তিন হাজার ২৮১ কোটি টাকা। এরপর মেঘনা গ্রুপের এক হাজার ৮০৯ কোটি টাকা।

স্প্যারো ক্রাউন গ্রুপের ঋণ এক হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা, স্নোটেক্স গ্রুপের এক হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, আবুল খায়ের গ্রুপের এক হাজার ৪৬১ কোটি টাকা, চৈতি গ্রুপের এক হাজার ২৮১ কোটি টাকা, দেশবন্ধু গ্রুপের এক হাজার ২০৩ কোটি টাকা, এসিএস গ্রুপের ৯৮৬ কোটি টাকা, এমএস গ্রুপের ৮৭৯ কোটি টাকা এবং ক্যাপিটাল বনানী ওয়ান লিমিটেডের ঋণ ৮১৬ কোটি টাকা।

এছাড়া ম্যাকসন গ্রুপের ঋণ ৭৯৮ কোটি টাকা, রূপায়ণ গ্রুপের ৭৮১ কোটি টাকা, নাভানা গ্রুপের ৭০০ কোটি টাকা, গিভেন্সি গ্রুপের ৬৮৯ কোটি টাকা, ডিজাইনটেক্স গ্রুপের ৬৪৮ কোটি টাকা, টিকে গ্রুপের ৫৯৫ কোটি টাকা, সিটি গ্রুপের ৫৭০ কোটি টাকা, কেয়া গ্রুপের ৫১৫ কোটি টাকা, অ্যারন ডেনিম লিমিটেডের ৫০৯ কোটি টাকা এবং বেঙ্গল গ্রুপের ঋণ ৫০৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সভাপতি মিজান উর রশিদ চৌধুরী বলেন, সাউথইস্ট ব্যাংক দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে। ফলে ঋণ খেলাপি বেড়েছে সাউথইস্ট ব্যাংকের। কমিশনের উচিত প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধ তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রতিষ্ঠানটি অল্প মুনাফা দেখিয়ে বিদেশে অর্থ পাচার করেছে।