আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানি আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি ২০২৫ সালে ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত অর্থবছরে নো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। এর আগে ২০২৪ সালের সমাপ্ত বছরের জন্যও ব্যাংকটি শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। মুলত খেলাপির পরিমাণ মোট ঋণের ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় পরপর দুই বছর লভ্যাংশ দিতে পারেনি এই ব্যাংকটি। এছাড়া ব্যাংকটিতে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশ থেকে ৫১৬ শতাংশ বেড়েছে।

মুলত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকের লুকানো বা নিয়মিতভাবে প্রদর্শিত পুরোনো খেলাপি ঋণগুলো পুনরায় শ্রেণিবিন্যাস করা হলে এই উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। এ কারণে গত বৃহস্পতিবার বিতর্কিত ব্যাংকটিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।

এদিকে আইএফআইসি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন বোর্ডের কার্যক্রম নিয়ে ব্যাংক খাতের মধ্যে উদ্বেগ তীব্র হচ্ছে। ব্যাংকের বিভিন্ন সূত্রের দাবি, তার নেতৃত্বে ব্যাংকের নীতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ত্রুটি ও অনিয়ম ঘটেছে। যা পর্যবেক্ষণের জন্য ইতোমধ্যে পর্যবেক্ষক নিয়োগে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আইএফআইসি ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরের মধ্যে লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা, যেখানে ২০২৪ সালের একই সময়ে মুনাফা ছিল মাত্র ৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতি লক্ষণীয়। একই সময়ে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৫৫ কোটি টাকায়, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৬০.৬৩ শতাংশ। যেখানে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৪,৩৮৯ কোটি টাকা, মোট ঋণের ৯.৯২ শতাংশ। এক বছরের মধ্যে খেলাপি ঋণ ৫১৬ শতাংশ বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি বোর্ড এবং চেয়ারম্যানের নেতৃত্বের ব্যর্থতার প্রমাণ। ব্যাংকের আর্থিক সূচকগুলোর অবনতি, সুশাসনের ঘাটতি এবং অনিয়ম রোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে। চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে আইএফআইসি ব্যাংকের বর্তমান ডিএমডি শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদ ন্যাশনাল ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালে ৯০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি করেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ডলার কারসাজি এবং নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার কারণে ব্যাংকের এই ক্ষতি হয়। তদন্ত চলাকালে দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। এ সব ঘটনার মধ্যেও তিনি আইএফআইসি ব্যাংকে ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে নিযুক্ত হন এবং বর্তমানে বহাল তবিয়তে আছেন। ব্যাংক-খাতের বেশ কয়েকজন সূত্র জানাচ্ছেন, এই নিয়োগের পেছনে চেয়ারম্যানের অনুমতি ও ঘনিষ্ঠতার প্রভাব রয়েছে।

চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আইএফআইসি ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অযোগ্য এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ এবং পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক, আঞ্চলিক প্রধান এবং বিভাগীয় প্রধানদের নিয়োগে স্বচ্ছতা ছিল না। অনেক কর্মকর্তা ব্যাংকিং খাতের মূলধারার অভিজ্ঞতা ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়। এ ধরনের নিয়োগ ব্যাংকের খরচের খাত ভারী করেছে এবং আর্থিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে।

ফলে আইএফআইসি ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদ ব্যাংকিং খাতে ক্ষমতার জটিল নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। তার পেছনে রয়েছে ডেপুটি গভর্নর কবির আহমেদ, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান ও ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মদ সারোয়ার। এছাড়া ডিএমডি আখতারের স্ত্রী ও ডেপুটি গভর্নরের স্ত্রী পারস্পরিক বান্ধবী হওয়ায় এই নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এর মাধ্যমে আখতার ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদ ও নীতিনির্ধারণে অনিয়ম ও প্রভাব ব্যবহার করছেন। অতীতের রেকর্ড অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালেও শেখ আখতার উদ্দিনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। বিশেষ করে ডলার কারসাজি করে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার ক্ষতির ঘটনা তদন্তে এসেছে। এছাড়া অনৈতিক পদোন্নতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও অতিরিক্ত সুদ সুবিধা দেওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে আসার পর ২০২১ সালে মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্ব পান আখতার। মাত্র ১৮ মাসে তিনি সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট হন এবং ২০২৩ সালে ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান। এই সময়ে ব্যাংকে প্রায় ৩০০ কর্মকর্তা নিয়োগের অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে বোর্ড সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছিল।
২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর গঠিত নতুন পর্ষদের সময়েও তিনি নিজের প্রভাব বজায় রেখেছেন এবং বর্তমান প্রশাসনের পছন্দের ব্যক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। এতে ব্যাংকের খরচের খাতা যেমন ভারী হয়েছে, তেমনি বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদায়নে ব্যাংকিং সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ ও তদন্ত থাকা সত্ত্বেও আখতার উদ্দিন এখনো আইএফআইসি ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল।

শেখ আখতার উদ্দিন বলেছেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং তিনি নিয়ম মেনেই ন্যাশনাল ব্যাংক ছেড়েছেন। তবে ব্যাংক খাতের অভ্যন্তরীণ সূত্রের মতে, তার ক্ষমতার পেছনের জোর ও অতীতের অনিয়ম ব্যাংকিং সুশাসনের জন্য উদ্বেগজনক।

এছাড়া আইএফআইসি ব্যাংকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিনিয়োগ উপদেষ্টা ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের নিয়ন্ত্রিত পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নতুন বোর্ড গঠন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে দেড় বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সেই বোর্ডের ওপর আবারও পর্যবেক্ষক বসিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর্থিক সূচকের অবনতি, সুশাসনের ঘাটতি এবং অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়। এছাড়া আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

ফলে বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশ থেকে প্রায় ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে। মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী হাজার হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করেছিলেন। ওই সময়ের ঋণগুলো খেলাপি হলেও নিয়মিতভাবে দেখানো হতো।

ফলে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে আইএফআইসির খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৫৫ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৬০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। আর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আইএফআইসির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২২ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা, বা ৫১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ফলে সেপ্টেম্বর শেষে আইএফআইসির মোট ঋণ স্থিতি ৪৪ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৭ হাজার ৫৫ কোটি টাকা।

এছাড়া আইএফআইসি ব্যাংকে প্রশ্ন উঠেছে যে বোর্ড পুনর্গঠনের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার কথা ছিল, তার ওপরই কেন আবার পর্যবেক্ষক বসাতে হলো? কেন্দ্রীয় ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে বোর্ডের ব্যর্থতার কথা অস্বীকার করলেও খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারার ব্যর্থতাই এ সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়েছে। তারা বলছেন, আইএফআইসি ব্যাংকে বিভিন্ন সময় ঋণ অনিয়ম, করপোরেট গভর্ন্যান্স দুর্বলতা ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের অভিযোগ উঠলেও এতদিন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিস্থিতি জটিল হওয়ার পর এখন অবজারভার বসিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কয়েকটা ব্যাংকে পর্যবেক্ষক বসানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংক আরও আগেই নিয়েছে। ব্যাংকের বোর্ডের সঙ্গে মিলে তারা কাজ করবে। ব্যাংকের বোর্ডের ব্যর্থতার কারণে পর্যবেক্ষক বসানো হয়েছে কি-না? আর বোর্ড ব্যর্থ হলে ভেঙে না দিয়ে কেন পর্যবেক্ষক বসানো হলো-এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা বোর্ডের ব্যর্থতার বিষয় নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন মনে করছে পর্যবেক্ষক বসানো দরকার, এ জন্য বসিয়েছে। বিশেষ কোন কারণ নয়।