ডেসকোর ঋণের বোঝা প্রায় ৪ হাজার ২১৫ কোটি টাকা
মেহেদী হাসান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই পিএলসি (ডেসকো) টানা তিন বছর বেশি লোকসানে রয়েছে। ফলে দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই পিএলসি (ডেসকো) বর্তমানে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে গ্রাহকসেবা আধুনিকায়ন এবং স্মার্ট গ্রিড বাস্তবায়নে সংস্থাটি সাফল্যের দাবি করলেও, অন্যদিকে আর্থিক লোকসান এবং বিশাল ঋণের বোঝা প্রতিষ্ঠানটির মেরুদণ্ড নড়বড়ে করে দিয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)-এর তথ্যনুযায়ী, কয়েক বছর ধরে ডেসকো লোকসানের বৃত্তে বন্দি হয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালে ৫৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং ২০২৪ সালে ৫০৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা নিট লোকসানের পর, ২০২৫ অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটি ১২৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা লোকসান গুনেছে। আয়ের এই নেতিবাচক ধারার কারণে পুঁজিবাজারে ডেসকোর শেয়ার বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে এসেছে।
কোম্পানিটি চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি ২৬-মার্চ ২৬) কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি লোকসান হয়েছে ৮১ পয়সা। গত অর্থবছরের একই সময়ে শেয়ার প্রতি লোকসান ছিল ১ টাকা ৮৩ পয়সা। অপরদিকে, অর্থবছরের তিন প্রান্তিকে (জুলাই ২৫-মার্চ ২৬) কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি মুনাফা হয়েছে ১ টাকা ৪৬ পয়সা। গত অর্থবছরের একই সময়ে শেয়ার প্রতি আয় লোকসান ছিল ১ টাকা ৯৮ পয়সা। ৩১ মার্চ, ২০২৬ শেষে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি সম্পদ (এনএভি) হয়েছে ৩৯ টাকা ৫ পয়সা। এদিকে কোম্পানিটির ঋণের বোঝা ক্রমাগত বাড়ছে।
ডিএসইর সূত্র মতে, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ডেসকোর দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৪৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণ ১ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে কোম্পানিটির মাথায় প্রায় ৪ হাজার ২১৫ কোটি টাকার ঋণের বোঝা চেপেছে। কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৯৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। উল্লেখ্য, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটি নিয়মিত ১০ শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ দিলেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি।
ডেসকোর সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনের চিত্রটি খুবই হতাশার। ২০২১ ও ২০২২ অর্থবছরে কোম্পানিটি কিছুটা লাভের মুখ দেখলেও, ২০২৩ সাল থেকে বিশাল অঙ্কের লোকসানের কবলে পড়ে। ডিএসইর ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে কোম্পানিটির নিট লোকসানের পরিমাণ ছিল ৫৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা। পরবর্তী বছর ২০২৪ সালেও ৫০৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা লোকসান হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে লোকসান কিছুটা কমিয়ে ১২৫ কোটি ১৯ লাখ টাকায় নামিয়ে আনলেও তা বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে যথেষ্ট হয়নি।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডেসকোর মালিকানায় সরকারের বড় অংশীদারত্ব (৬৭.৬৬ শতাংশ) থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কোম্পানিটি নিয়ে অনাস্থা বাড়ছে। বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ২৩.৪৩ শতাংশ শেয়ার এবং সাধারণ জনগণের হাতে মাত্র ৮.৮৭ শতাংশ।
ডেসকোর এই আর্থিক পতনের পেছনে বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ, অতিরিক্ত খরচ এবং ঋণের সুদ পরিশোধের চাপকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও ৬১৯ কোটি ৪২ লাখ টাকার একটি ‘পুনর্মূল্যায়ন সঞ্চিতি’ কোম্পানিটির রিজার্ভে যুক্ত আছে, কিন্তু নগদ প্রবাহ বা অপারেশনাল আয় না বাড়লে এই সংকট সহজে কাটবে না। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের অতি সতর্কতার সাথে ডেসকোর মতো দুর্বল মৌল ভিত্তির শেয়ারে লেনদেন করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশের বিদ্যুৎ খাতের অব্যাহত সংস্কার ও পুনর্গঠন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সেবার মানোন্নয়ন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে ১৯৯৬ সালের ৩ নভেম্বর গঠিত হয় ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই (ডেসকো)। মূলধন ও প্রারম্ভিক কার্যক্রম প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে ডেসকো আনুষ্ঠানিকভাবে তার বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। সে সময় ৫০০ কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধন নিয়ে তৎকালীন ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই অথরিটি (ডেসা) থেকে মিরপুর অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা অধিগ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটি।
গত কয়েক দশকে মিরপুর থেকে শুরু করে রাজধানীর একটি বড় অংশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে ডেসকো দায়িত্ব পালন করে আসছে। মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, কল্যাণপুর, ক্যান্টনমেন্ট, গুলশান, বনানী, মহাখালী, উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, বারিধারা, বাড্ডা, টঙ্গী এবং পূর্বাচলসহ প্রায় ২৪৫ বর্গকিলোমিটার ডেসকোর আওতাভুক্ত।
ডেসকো সূত্রে জানা গেছে, গত তিন বছরে সংস্থাটির গ্রাহক সংখ্যা ১২ লাখ ৪০ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৪৯ হাজার ৫৭৮ জনে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামাল দিতে সংস্থাটি প্রাক-পরিশোধ বা প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপনে বিশেষ জোর দিয়েছে।
২০২৩ সালে যেখানে প্রি-পেমেন্ট মিটারের সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৭১ হাজারের কিছু বেশি, ২০২৫ সালের জুনে তা বেড়ে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে। গত তিন বছরের ব্যবধানে ডেসকোর সিস্টেম লস ৫.৭২ শতাংশ থেকে কমে ৫.৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমানে ডেসকোর বিতরণ লাইন ৬ হাজার কিমি অতিক্রম করেছে।
এ বিষয় জানতে চাইলে ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির কোম্পানি সচিব প্রকৌশলী এসএম শাহ সুলতান বলেন, এবারই প্রথম নিট প্রফিট সামান্য হলেও বেড়েছে। তিনি দেড় মাস হলো দায়িত্ব নিয়েছেন। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাননি।
২০০৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ডেসকোর অনুমোদিত মূলধন ২ হাজার কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ৩৯৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ৩৯ কোটি ৭৫ লাখ ৬৯ হাজার ৮০৪। এর ৬৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ রয়েছে সরকারের কাছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২৩ দশমিক ৪৩, বিদেশী বিনিয়োগকারী দশমিক শূন্য ৪ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।



