১০ ব্যাংক জেড ক্যাটাগরিতে, রেকর্ড মুনাফা করলেও ব্যাংক খাতে দরপতন
মনির হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের অর্থনীতির অস্থিরতা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতার মধ্যেও ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতে মুনাফার বড় চমক দেখা গেছে। তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে ২১টির ব্যাংকের মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংকসহ অন্তত ১০টি ব্যাংক ইতিহাসের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের রেকর্ড গড়েছে। তবে এই রেকর্ড মুনাফার বিপরীতে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর অবস্থান মোটেও সন্তোষজনক নয়।
কারণ বড় অঙ্কের মুনাফা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অর্ধেকের বেশি ব্যাংকই বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিতে না পেরে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
মুলত জেড ক্যাটাগরিতে অবনমনকৃত ব্যাংকগুলো হলো: এবি ব্যাংক পিএলসি, আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি, ওয়ান ব্যাংক পিএলসি, প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি, রূপালী ব্যাংক পিএলসি, এনআরবি ব্যাংক পিএলসি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি ও এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি।
তবে ব্যাংকগুলোর এই অস্বাভাবিক মুনাফার প্রধান উৎস ছিল সাধারণ মানুষের আমানত সরাসরি সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের পরিমাণ ৪০ শতাংশ বেড়ে ৫ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
মুলত ২০২৫ সালে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি। বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ৫৭ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ২৫১ কোটি টাকা হয়েছে। এটি একক বছরের ব্যাংকটির সর্বোচ্চ মুনাফার রেকর্ড। ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছরে সিটি ব্যাংকের মুনাফা ৩১ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা হয়েছে। বছরের ব্যবধানে ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ২০২৫ সালে পূবালী ব্যাংকের নিট মুনাফা হয়েছে ১০৯০ কোটি টাকা। এটি প্রথমবারের মতো ব্যাংকটির হাজার কোটির বেশি মুনাফা অর্জনের রেকর্ড।
আলোচিত বছরে ব্র্যাক ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৯ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৭ শতাংশের বেশি। আর বছরটিতে ব্যাংকটির সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের পরিমাণও বেড়েছে। তাছাড়া খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে ২ শতাংশের আশপাশে নেমেছে। সিটি ব্যাংকেও আমানত ও ঋণ প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমেছে। তবে বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে আয় ১৪৪ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ৫৬২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
এ ছাড়া পূবালী ব্যাংকেও খেলাপি ঋণ কমার পাশাপাশি আমানত ২১ শতাংশ বেড়েছে। আলোচিত সময়ে ব্যাংকটির সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের পরিমাণও বেড়েছে। অর্থাৎ বড় মুনাফা করা তিনটি ব্যাংকেই আমানত বাড়লেও মুনাফার বড় অংশ বিল ও বন্ডে নির্ভর করে বেড়েছে। রেকর্ড মুনাফা করা অন্য ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়ানোর তথ্য মিলছে আর্থিক প্রতিবেদনে। আলোচিত বছরটিতে এই তিনটি ব্যাংকের পাশাপাশি ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকেও রেকর্ড মুনাফা অর্জিত হয়েছে।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) চেয়ারম্যান আবু আহামেদের বলেন, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের উচ্চহার বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। অনেক ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনেও স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে, যার কারণে প্রকৃত আর্থিক অবস্থার ওপর বিনিয়োগকারীরা পরিষ্কার ধারণা পাচ্ছেন না। ফলে শেয়ারের চাহিদা কমে যাচ্ছে এবং দাম পড়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নীতিমালা ও উচ্চ সুদের হারও ব্যাংকের মুনাফায় চাপ সৃষ্টি করছে। এতে করে ব্যাংকের ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, যা সরাসরি পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকগুলো গত বছর যে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে, তার বেশিরভাগই মূলত জনসাধারণ থেকে সংগৃহীত আমানতের অর্থ সরাসরি সরকারি সিকিউরিটিজে (বিল-বন্ডে) বিনিয়োগ থেকে এসেছে। এটি ব্যাংকগুলোর জন্য নিরাপদ ব্যবসা হলেও ব্যাংকিং লাইসেন্সের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই কোনো মডেলও নয়।



