যুগোপযোগী পুঁজিবাজার গঠনে সিএসইর ছয় প্রস্তাব
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: যুগোপযোগী পুঁজিবাজার গঠনে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় তিন বছর করমুক্ত রাখাসহ ছয় দফা প্রস্তাব দিয়েছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)। আজ রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে এই প্রস্তাব তুলে ধরে সংস্থাটি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আমরা আনন্দের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে: বাজেটে কমোডিটি এক্সচেঞ্জের পাশাপাশি আরইআইটিএস, ইটিএফএস, ইনডেক্স হেজিং এবং কারেন্সি হেজিং ইন্সট্রুমেনন্টসের সম্ভাবনাও পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সরকার বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে কেবল শেয়ার লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ, বহুমাত্রিক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ফিন্যান্সিয়াল মার্কেট ইকোসিস্টেম হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।
সিএসইর আধুনিক ট্রেডিং ইঞ্জিন (নেক্সট জেনারেশন ট্রেডিং সিস্টেম) যেকোনো ধরণের ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজ, গ্রিন বন্ড, সুকুক, ইনডেক্স ডেরিভেটিভস এবং ইকুইটি ডেরিভেটিভস লেনদেনের জন্য সম্পূর্ণ উপযোগী এবং প্রস্তুত।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুর রহমান মজুমদার। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান ও পরিচালক মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম। লিখিত বক্তব্যের শুরুতে জাতীয় বাজেটে দেশের পুঁজিবাজারের আধুনিকায়ন, গভীরতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে গৃহীত বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বর্তমান ব্যাংক নির্ভর অর্থায়ন কাঠামোর পরিবর্তে অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেছেন যে পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্র নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী মূলধন সংগ্রহ, অবকাঠামো অর্থায়ন, সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত করবে। পরে একটি যুগোপযোগী পুঁজিবাজার গঠনের জন্য ছয় দফা প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
প্রস্তাবের প্রথম দফায় বলা হয়, বাংলাদেশের প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ স্থাপনের জন্য সিএসই টেকনোলজিক্যাল এবং রেগুলেটরি কাঠামো ইতিমধ্যে সমাপ্ত করেছে, যা উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। একটি আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বমানের এক্সচেঞ্জ স্থাপনের জন্য প্রচুর বিনিয়োগের প্রয়োজন যা চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ তার সীমিত আয়ের মাধ্যমে সংস্থান করছে। উপরোক্ত বিবেচনায় চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের কমোডিটি সেগমেন্টকে আগামী ৫ বছরের জন্য কর অবকাশ প্রদান করা হলে একটি যুগপোযোগী মার্কেট গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয়, আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে তালিকাভুক্ত এবং অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যকার কর হারের ব্যবধান ৭ দশমিক ৫ শতাংশ রাখা হয়েছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির সাথে তালিকাবহির্ভুত কোম্পানির কর হারের ব্যবধান ১০ শতাংশ করার জন্য অনুরোধ করছি। যা ভাল কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত করবে এবং স্বচ্ছ কর্পোরেট রিপোর্টিং এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে।
তৃতীয় প্রস্তাবে বলা হয়, নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানি সমূহের আয় তিন বছর করমুক্ত রাখা হলে অতালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত হবে। এতে পুঁজিবাজারে গুণগত মানসম্পন্ন শেয়ারের যোগান বাড়বে যা বাজারে লেনদেন বৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা আনয়নে ভূমিকা পালন করবে।
চতুর্থ প্রস্তাবে তুলে ধরা হয়, বর্তমানে অনাবাসী ব্যক্তিকে কারিগরি বা টেকনিক্যাল সেবার বিপরীতে পরিশোধের উপর ২০ শতাং হারে উৎসে কর কর্তনের বিধান আছে। এছাড়া সফটওয়্যার মেইনটেন্যান্স খাতে ১৫ শতাংশ হারে মুসক কর্তনের বিধান আছে, যা অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত ডিজিটালাইজেশনের পরিপন্থী। এই উৎসে কর যৌক্তিকভাবে ১০ শতাংশ এবং মূসক হার ৫ শতাংশে এ কমিয়ে আনার প্রস্তাব করছি।
পঞ্চম প্রস্তাবে বলা হয়, অর্থমন্ত্রী দেশের অর্থবাজারের কাঠামোর অতি প্রয়োজনীয় সেগমেন্ট কর্পোরেট বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণের কথা বলেছেন এবং পাশাপাশি মিউনিসিপ্যাল বন্ড, সুকুক, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যাংক ব্যবস্থার বিকল্প অর্থায়নের কৌশল উল্লেখ করেছেন। কিন্তু, বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রানীতি এবং সুদ হারের আলোকে কর্পোরেট বন্ড মার্কেটসহ এই সমস্ত আর্থিক পণ্যের মার্কেট পেনেট্রেশনের কোনো কৌশল আমরা বাজেট কাঠামোয় লক্ষ্য করিনি।
উপরন্তু জিরো কুপন বন্ডের উপর বিদ্যমান কর অব্যহতি প্রত্যাহার করা হয়েছে যা প্রস্তাবিত বাজেট কৌশলের পরিপন্থী। আমরা মনে করি জিডিপির অন্তত ২শতাংশ কর্পোরেট বন্ড মার্কেটের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত এবং তার জন্য বর্তমান অর্থ কাঠামো বিবেচনায় পেনেট্রেশনের কৌশল নেয়া প্রয়োজন।
সর্বশেষ প্রস্তাবে তুলে ধরা হয়, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে ডিভিডেন্ড আয়ের উপর ২০ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য যা প্রস্তাবিত অর্থ বিলে প্রত্যাহার করা হয়েছে। যার ফলে ডিভিডেন্ড আয়ের উপর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হারে কর ধার্য করা হবে যা পুঁজিবাজার বিকাশে অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আমরা এই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে বিদ্যমান ২০ শতাংশ হারে কর আরোপ অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করছি।



