দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর দেশের পুঁজিবাজারে আবারও চালু হয়েছে রিয়েল-টাইম নজরদারি ব্যবস্থা। অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সন্দেহজনক লেনদেন এবং সম্ভাব্য কারসাজি শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার অংশ হিসেবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সম্প্রতি কয়েকটি শেয়ারের লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, কোনো কোম্পানির শেয়ারদরে অস্বাভাবিক উত্থান বা লেনদেনে অসঙ্গতি দেখা দিলে এখন শুধু সতর্কবার্তা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হচ্ছে না। প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে লেনদেন স্থগিত করে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুটি কোম্পানির শেয়ারদরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করার পর এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরদিন আবার সেসব শেয়ারের লেনদেন চালু করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য বাজারে গুজব ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি এবং অসাধু চক্রের প্রভাব কমানো। একই সঙ্গে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগেভাগে সতর্ক করে সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে রক্ষা করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজিবাজারে অনেক সময় মৌলভিত্তি দুর্বল বা উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকা কোম্পানির শেয়ারদর হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যবসায়িক কারণের চেয়ে কারসাজি বা কৃত্রিম চাহিদা তৈরির অভিযোগ বেশি দেখা যায়। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হয়ে বিনিয়োগ করে পরে ক্ষতির মুখে পড়েন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শীর্ষ এক ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মনে করেন, উৎপাদন বন্ধ থাকা বা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্থবিরতা থাকা কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিক নয়। তাই এ ধরনের ক্ষেত্রে লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি কার্যকর সতর্ক সংকেত হিসেবে কাজ করবে।

তিনি আরো বলেন, কোন পরিস্থিতিতে ডিএসই সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে, তার জন্য আরও স্পষ্ট ও স্বচ্ছ নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। এতে বাজার অংশগ্রহণকারীরা আগে থেকেই নিয়ম সম্পর্কে অবগত থাকবে এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হবে না। বাজার মধ্যস্থতাকারীদের সংগঠনের নেতারাও এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

এছাড়া বছরের পর বছর উৎপাদন বন্ধ থাকা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমহীন কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে অস্বাভাবিক উত্থান বাজারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক উন্নত বাজারে এমন কোম্পানির লেনদেন দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থগিত কিংবা শেষ পর্যন্ত তালিকাচ্যুত করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল ও অকার্যকর কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন বাজারে সক্রিয় থাকলে তা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে কার্যকর নজরদারির পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মান যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

মুলত পুঁজিবাজারে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ইতিহাসও বেশ পুরোনো। ২০১০ সালের বাজার ধসের পর নজরদারি ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে আসে। এরপর আন্তর্জাতিক মানের একটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় উন্নত সফটওয়্যারভিত্তিক সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম চালু করা হয়, যা অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি, লেনদেনের ধরণ এবং ভলিউম বিশ্লেষণ করে সতর্কবার্তা দিতে সক্ষম।

২০১৫ ও ২০১৬ সালে এই ব্যবস্থার আওতায় বেশ কয়েকটি কোম্পানির লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে নীতিগত পরিবর্তনের কারণে এই ধরনের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সন্দেহজনক লেনদেনের ক্ষেত্রে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাজারে শেয়ার কেনাবেচা চলতে থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আবারও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের নীতি গ্রহণ করেছে। নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ইনসাইডার ট্রেডিং, মূল্য কারসাজি এবং তথ্য গোপনের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের উদ্দেশ্য কোনো শেয়ারের দাম নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং বাজারে ন্যায্য মূল্য নির্ধারণের পরিবেশ নিশ্চিত করা। মূল্য নির্ধারণ করবে বাজারের প্রকৃত চাহিদা ও যোগান, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কারসাজি নয়। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব কোম্পানির লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে, সেগুলো বাজারের ‘জেড’ শ্রেণিভুক্ত।

অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও পরিচালনাগত অবস্থান নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন রয়েছে। একটি কোম্পানির শেয়ার এক মাসে ৬৬ শতাংশের বেশি এবং অন্যটির শেয়ারদর দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ার পর নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়।

ডিএসইর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো কোম্পানির শেয়ারদরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে জানতে চাওয়া হয় এমন কোনো মূল্যসংবেদনশীল তথ্য আছে কি না, যা দরবৃদ্ধির কারণ হতে পারে। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে লেনদেনের ধরণ বিশ্লেষণ করে সাময়িক স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। পরে প্রয়োজন হলে বিস্তারিত তদন্তও পরিচালনা করা হবে।

ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মতে, উন্নত বিশ্বের পুঁজিবাজারে রিয়েল-টাইম নজরদারি একটি স্বাভাবিক ও বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় ভবিষ্যতেও প্রয়োজন অনুযায়ী একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মুখপাত্রের ভাষ্য, অতীতে সন্দেহজনক লেনদেনের তদন্ত শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগত। এর মধ্যে অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়তেন। এখন তাৎক্ষণিক সতর্কতা ও অস্থায়ী স্থগিতাদেশের মাধ্যমে ঝুঁকি সম্পর্কে আগেভাগেই ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, রিয়েল-টাইম নজরদারির পুনঃপ্রবর্তন দেশের পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে ধারাবাহিক প্রয়োগ, স্বচ্ছ নীতিমালা এবং কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থার ওপর।