আইপিডিসি ফাইন্যান্সের এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১০ শতাংশ
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক খাতের কোম্পানি আইপিডিসি ফাইন্যান্সের গত এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৯ কোটি টাকার বেশি বা ১০ শতাংশ। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির আমানতকারীরা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। এছাড়াও সম্প্রতি শেয়ার দর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় কোম্পানিটিতে বিনিয়োগে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকতে বলেছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর (৩১ ডিসেম্বর ২০২৪) আইপিডিসি ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০৫ কোটি ৬৭ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭৩ টাকা। আর বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৪৪৫ কোটি ২৫ লাখ দুই হাজার ৯৬ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৯ কোটি ৫৭ লাখ ৫৪ হাজার ১২৩ টকা।
এ ব্যাপারে আইপিডিসি কর্তৃপক্ষ জানায়, কোভিড পরবর্তী সামগ্রিক দুর্বল ব্যবসায়িক পরিবেশ, সচরাচর পলিসি পরিবর্তন, রাশিয়া-ইউক্রেন, মিডেল ইস্টের যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব এবং দেশের রাজনৈতিক রদবদল এবং অস্থিরতা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরুপ প্রভাব ফেলে। তারই ফলশ্রুতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উর্ধ্বমুখী সুদের হার এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের ফলে নির্দিষ্ট কিছু গ্রাহকদের ওপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়।
আমদানি সীমাবদ্ধতা ও সার্বিক ব্যবসায়িক মন্দার কারণে বহু প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়ের পাশাপাশি নগদ প্রবাহ হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে তাদের জন্য সময় মতো ঋণ পরিশাধের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এছাড়া পূর্বে প্রদত্ত ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়া এবং ঋণ শেণীকরণে রক্ষণশীলনীতি অনুসরণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এনপিএল রেশিও কমানোর জন্য আইপিডিসি তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান যখন খেলাপি ঋণের বেড়াজালে আটকে যায়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমানতকারীদের আস্থা দিন দিন কমতে থাকে। কারণ যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ, আমানতকারীদের আমানত ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা কমিয়ে দেয়। আইপিডিসির বর্তমান খেলাপি ঋণ
কোনাভাবেই প্রত্যাশিত নয়। এতে করে কোম্পানিটির প্রতি আমানতকারীদের আস্থা, বিশ্বাস কমতে শুরু করেছে।
কোম্পানি সূত্রে আরও জানা গেছে, গত বছর আইপিডিসির নিট সুদজনিত আয় হয়েছিল ২৩৯ কোটি ২৭ লাখ ৪ হাজার ২৯০ টাকা। আর বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২০০ কোটি ৫৮ লাখ ৪১ হাজার ৮০১ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে নিট সুদজনিত আয় কমেছে ৩৮ কোটি ৬৮ লাখ ৬২ হাজার ৪৮৯ টাকা বা ১৬ শতাংশ।
এ ব্যাপারে আইপিডিসি জানিয়েছে, যেহেতু ইন্টারেস্ট ইনকামের থেকে ইন্টারেস্ট ব্যয় (সকল আমানত ও কর্জ) বাদ দিয়ে নিট সুদ আয় বের করা হয়, কিন্তু এই আমানত ও কর্জেও একটা উল্লেখযোগ্য অংশ তুলনামূলক নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে যা নিট সুদে প্রতিফলিত হয়নি বরং ইনভেস্টমেন্ট ইনকামে প্রতিফলিত হয়েছে। যার ফলে ২০২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানের সুদ আয় ২০২৪ সালের তুলনায় ৭৪৮.৬১ মিলিয়ন বৃদ্ধি পেয়ে ৭৫৫৩.৯৩ মিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে, যার ফলে নিট সুদ আয় ২০০৫.৮৪ মিলিয়ন টাকায় উপনীত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় হ্রাস নির্দেশ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিট সুদজনিত আয় কমে যাওয়া মোটেও ভালো কিছু নয়। আইপিডিসির নিট সুদজনিত আয় কমে যাওয়ায় আগামীতে কোম্পানিটির আমানত সংগ্রহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এদিকে সম্প্রতি আইপিডিসি ফাইন্যান্সের শেয়ার দর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে।
শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ বিষয়ে আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, আইপিডিসির শেয়ারের সাম্প্রতিক দর বৃদ্ধির কারণ জানতে গত ১৫ মে কোম্পানিটিকে চিঠি পাঠানো হয়। জবাবে কোম্পানিটি জানায়, তাদের কাছে এমন কোনো অপ্রকাশিত বা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই, যার কারণে শেয়ারের দাম বাড়তে পারে। এর পরই শেয়ারটির লেনদেনে কোনো ধরনের কারসাজি হয়েছে কি না, তা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় বিএসইসি। একই সঙ্গে কমিশনের সার্ভিল্যান্স বিভাগ কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, গত ২ জুন আইপিডিসি ফাইন্যান্সের শেয়ারের দাম ছিল ১৮ টাকা ৯০ পয়সা। মাত্র ১২ কার্যদিবসের ব্যবধানে ১৮ জুন তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৯ টাকা ৬০ পয়সায়। অর্থাৎ এ সময়ে শেয়ারটির দর বেড়েছে ১০ টাকা ৭০ পয়সা বা ৫৬ দশমিক ৬১ শতাংশ। তবে মঙ্গলবার (২৩ জুন) এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শেয়ারটির দর ছিল ২৯ টাকা ৪০ পয়সা। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের দ্রুত ও অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির পেছনে কোম্পানিটির কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য বা উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক অগ্রগতির খবর না থাকায় কারসাজির সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে।
বিএসইসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, তদন্তে দেখা হবে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কোনো সমন্বিত কারসাজিমূলক বা অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে কি না, অপ্রকাশিতমূল্য সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহার করে ইনসাইডার ট্রেডিং সংঘটিত হয়েছে কি না এবংসংশ্লিষ্ট স্টক ব্রোকার, স্টক ডিলার ও তাদের অনুমোদিত প্রতিনিধিরা মার্জিন রুলস ও কমিশনের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করেছেন কি না। এছাড়া সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মধ্যস্থতাকারীদের কোনো ভূমিকা বা দায় রয়েছে কি না এবং সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনসহ অন্য কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তাও তদন্তের আওতায় থাকবে।
একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউসগুলোর অনুমোদিত প্রতিনিধি (এআর), কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। বিএসইসির মতে, এ ধরনের সন্দেহজনক লেনদেন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক-ডিলার, স্টক-ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি) বিধিমালা, ২০০০-এর দ্বিতীয় তফসিলের আচরণবিধি ৬ ও ৮এবং বিধি ১১-এর সম্ভাব্য লঙ্ঘনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে।
আইপিডিসি ফাইন্যান্সের পরিশোধিত মূলধন ৪২৯ কোটি ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ৪২ কোটি ৯৫ লাখ ৮৪ হাজার ৮৫১ টি। উদ্যোক্তাদের হাতে ৪০ শতাংশ, সরকারের হাতে ২১ দশমিক ৮৮ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৯ দশমিক ১২ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।



