আন্তর্জাতিক বাজারে দাপট দেখাচ্ছে ওষুধশিল্প, ৬ বিলিয়ন ডলারের বাজার
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের ওষুধশিল্প দ্রুত সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে শিল্পের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আছে বাড়তি প্রতিযোগিতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদ, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্বল্পতা। গবেষণা-উন্নয়ন, উৎপাদন সম্প্রসারণ ও মূলধন সংগ্রহে পুঁজিবাজার বড় সহায়তা করতে পারে। এজন্য নীতিগত স্থিতিশীলতা, কর প্রণোদনা ও স্বচ্ছ বাজারকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। তবে দেশে ওষুধের চাহিদা মেটাতে একসময় তাকিয়ে থাকতে হতো বিদেশের দিকে। সে চিত্র এখন বদলেছে।
ওষুধের অভ্যন্তরীণ বাজার এখন প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলারের। স্থানীয় চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণ করার সক্ষমতা অর্জন করেছেন দেশীয় উৎপাদকরা। শুধু তাই নয়, বিদেশের বাজারে বাড়ছে বাংলাদেশি ওষুধের দাপট। দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের ১৩২টি দেশে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই উপস্থিতি এখন আর ছোট পরিসরের নয়। গত ১০ বছরে ওষুধ রপ্তানি ৮৯ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৩৮ মিলিয়ন ডলার হয়েছে, অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৬৭ শতাংশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে ২৩৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ২১৩ মিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক বাণিজ্যে নানা ওঠানামার মধ্যেও আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ওষুধশিল্পের ধারাবাহিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরছে এই প্রবৃদ্ধি। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো কঠোর মাননিয়ন্ত্রণের বাজারেও বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে, যা বাংলাদেশের শিল্পের মান ও সক্ষমতা প্রমাণ করে। ফলে স্থানীয় বাজারে সক্ষমতা অর্জনের পর বৈশ্বিক বাজারে আরও বড় অংশ দখলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের সামনে।
গত এক দশকে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানিতে সামগ্রিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রপ্তানি ছিল ৮৯ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৮ মিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, ১০ বছরে রপ্তানি বেড়েছে ১৪৯ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৬৭ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২১-২২ পর্যন্ত রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বেড়ে হয় ৮৯ মিলিয়ন থেকে ১৮৯ মিলিয়ন ডলার। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি কিছুটা কমে ১৭৫ মিলিয়ন ডলারে নামে। এরপর আবার শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ফিরে আসে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি ২০৫ মিলিয়ন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২১৩ মিলিয়ন এবং সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৩৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বিশেষ করে সবশেষ বছরে রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ২৫ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। সামগ্রিক চিত্র বলছে, মাঝখানে সাময়িক পতন থাকলেও বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের রপ্তানি বাজার ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি আরও দৃশ্যমান।
বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানির শীর্ষ ১০ গন্তব্যের মধ্যে শ্রীলঙ্কা প্রথম, যেখানে রপ্তানির পরিমাণ ৩০ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে মিয়ানমার ৩০ মিলিয়ন, ফিলিপাইন ১৯ মিলিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ১৯ মিলিয়ন, কম্বোডিয়া ১২ মিলিয়ন, আফগানিস্তান ১২ মিলিয়ন, কেনিয়া ১১ মিলিয়ন, পাকিস্তান ১০ মিলিয়ন, চিলি ৯ মিলিয়ন এবং যুক্তরাজ্য ৪ মিলিয়ন ডলার।
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী বলেন, ওষুধ রপ্তানিতে নীতিগতভাবে কোনো বাধা নেই। অতীতে মূল্যসংক্রান্ত কিছু জটিলতা ছিল, তবে সেগুলো নিয়ে সরকারের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে আমরা আন্তরিক সহযোগিতা পাচ্ছি। আমাদের সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং সার্বিকভাবে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পাশাপাশি আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদন নিশ্চিত করছি। এ কারণে বিদেশি বাজারে বাংলাদেশি ওষুধের গ্রহণযোগ্যতা ও চাহিদা বাড়ছে, যা রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিচ্ছে। সম্প্রতি ফিলিপাইনে নতুন অনুমোদন পেয়েছেন এবং আসিয়ান অঞ্চলকে সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে দেখছেন বলে জানান তিনি। তপন বলেন, ওই অঞ্চলে এখনো বিপুল পরিমাণ ওষুধ আমদানি করা হয়, ফলে সেখানে বাংলাদেশের জন্য ভালো সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে নিজস্ব চাহিদার ৮৫ শতাংশের বেশি ওষুধের কাঁচামাল বা সক্রিয় ওষুধ উপাদান বিদেশ থেকে আমদানি করে। এ খাতে বছরে ব্যয় হয় প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকার ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করছে। এ উদ্যোগ সফল হলে দেশে কাঁচামাল উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি সক্ষমতাও বাড়বে।
এছাড়া মুন্সিগঞ্জে বিসিকের ২০০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন পার্ক দেশে কাঁচামাল উৎপাদনের অবকাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সক্রিয় ওষুধ উপাদান (এপিআই) রপ্তানিতে ৫ শতাংশ এবং ওষুধপণ্যে ৬ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। এছাড়াও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্যসংক্রান্ত মেধাস্বত্ব অধিকার চুক্তির ছাড় বাংলাদেশকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বড় সুবিধা দিচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে পরিপক্ব ওষুধশিল্প থাকা বাংলাদেশ এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন ও রপ্তানি আরও বাড়াতে পারে।
সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত ১৩২টি দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। এতে আমরা গর্বিত। এখন দেশে টিকা তৈরি করতে পারলে সেটার পরিসর আরও বাড়বে। ওষুধ শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করতে আমরাও সহযোগিতা করে যাব।



