বিটিআরসির ২৮ কোটি টাকা দিচ্ছে না আমরা টেকনোলজিস
বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তথ্য ও প্রযুক্তি খাতের কোম্পানি আমরা টেকনোলজিস বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করছে না। প্রতিষ্ঠানটি রাজনীতিসহ বিভিন্ন প্রভাব খাটিয়ে পাওনা টাকা পরিশোধে সময়ক্ষেপণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিটিআরসির একটি সূত্র বলছে, পাওনা আদায়ে বিটিআরসি যখনই উদ্যোগ নিয়েছে তখনই কিস্তির সুযোগ প্রার্থনা করেছে আমরা টেকনোলজিস কর্তৃপক্ষ।
কিস্তির সুযোগ দিলে তখন কিস্তির সংখ্যা বাড়ানোর দাবি তুলেছে। আবার কিস্তির সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ দিলে বিলম্ব ফি মওকুফের আবেদন করেছে। এতেও পাওনা আদায় করা যায়নি। ঘুরেফিরে আমরা টেকনোলজিস ‘কিস্তির ফিরিস্তিতে’ আটকে আছে।
বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে আইআইজি লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকেই আমরা টেকনোলজিস লিমিটেড নিয়মিত রাজস্ব পরিশোধে অনীহা দেখিয়ে আসছিল। নথি অনুযায়ী, আমরা টেকনোলজিসের কাছে রেভিনিউ শেয়ারিং, লাইসেন্স ফি, মূসক এবং বিলম্ব ফি বাবদ সরকারের বকেয়া রয়েছে ২৮ কোটি ৩৯ লাখ ১৮ হাজার ৭২১ টাকা।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) বকেয়া পরিশোধ করছে না আমরা টেকনোলজিস লিমিটেড। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও বিপুল পরিমাণ বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করেনি আইআইজি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানটি। এজন্য কয়েক দফায় কোম্পানিটির ব্যান্ডউইথ ব্লক করে দেওয়া হয়। এরপরও বকেয়া রাজস্ব পরিশোধে ব্যর্থতার পাশাপাশি লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গের দায়ে আমরা টেকনোলজিস লিমিটেডের ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিটিআরসি।
সংস্থাটির সর্বশেষ কমিশন সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আমরা টেকনোলজিসের লাইসেন্স বাতিল করার লক্ষ্যে সরকারের পূর্বানুমোদন চেয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পত্র পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। বিটিআরসির ৩০৯তম কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অনুমোদনের পর আমরা টেকনোলজিসের আইআইজি ব্যবসার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটবে।
এর আগে পাওনা আদায়ে কয়েক দফায় আমরা টেকনোলজিসের শতভাগ ব্যান্ডউইথ ব্লক করে দেয় বিটিআরসি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বারবার নোটিশ-চেষ্টার পর পাওনা আদায় না করতে পেরে ২০২২ সালের জুলাইয়ে ৪১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বকেয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটির ৫০ শতাংশ ব্যান্ডইউথ ক্যাপাসিটি ব্লক করে বিটিআরসি। তখন ২০ কোটি টাকা পরিশোধ করলে ব্লক তুলে নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পরবর্তী সময়ে আবারও পাওনা পরিশোধে টালবাহানা শুরু করলে ২০২৩ সালের শেষে ৮০ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটির শতভাগ ব্যান্ডউইথ ক্যাপিং করে দেয় বিটিআরসি। বর্তমানে আমরা টেকনোলজিসের ব্যান্ডউইথে শতভাগ ক্যাপিং রয়েছে।
কমিশনের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও বকেয়া পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠানটি আইআইজি গাইডলাইনের শর্ত ৮ দশমিক ০২ এবং লাইসেন্সের শর্ত ৪ দশমিক ০২ সরাসরি লঙ্ঘন করেছে। এর আগে প্রতিষ্ঠানটিকে বকেয়া পরিশোধের জন্য একাধিকবার কিস্তি সুবিধা দেওয়া হলেও তারা তা পরিপালন করেনি, যা কমিশনের আস্থার সংকট তৈরি করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে আমরা টেকনোলজিসের আইআইজি লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় বিটিআরসি এবং লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না—মর্মে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর চিঠি দেওয়া হয়।
লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর আমরা টেকনোলজিস গত জুনে বকেয়া পরিশোধের একটি প্রস্তাব বিটিআরসির কাছে জমা দেয়। বিটিআরসির কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবে প্রতিষ্ঠানটি বকেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নিলেও গতানুগতিক কায়দায় কিছু দাবি এবং নতুন প্রস্তাব উত্থাপন করে। প্রতিষ্ঠানটির আবেদনে দাবি করা হয়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাদের বকেয়া ছিল ২৫ কোটি ৯৬ লাখ ৬৭ হাজার ৫২০ টাকা।
এর মধ্যে তাদের প্রকৃত বকেয়া ছিল ১২ কোটি ১ লাখ ১৮ হাজার ৫২৭ টাকা এবং বাকি ১৩ কোটি ৯৫ কোটি ৪৮ লাখ ৯৯২ টাকা বিলম্ব ফি ও জরিমানা হিসেবে আরোপিত হয়েছে। বকেয়া পরিশোধের লক্ষ্যে আমরা টেকনোলজি বিটিআরসির কাছে প্রস্তাব করে, তাদের প্রকৃত বকেয়ার মাত্র ৫ শতাংশ বা ৬০ লাখ ৫ হাজার ৯২৬ টাকা ডাউন পেমেন্ট হিসেবে জমা দেবে এবং অবশিষ্ট টাকা পরবর্তী ৪৮টি সমান মাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করবে।
এ ছাড়া ডাউন পেমেন্ট জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ওপর আরোপিত শতভাগ ব্যান্ডউইথ ক্যাপিং প্রত্যাহার করে তাদের আইআইজি অপারেশন ফের শুরু করতে দেওয়ার অনুরোধ জানায় প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে অপারেশন ফের শুরু করার পর ব্যবসা গুছিয়ে নিতে প্রথম কিস্তি শুরু করার আগে তিন মাসের সময়ও চায় আমরা টেকনোলজিস।
তবে প্রস্তাবটি বিস্তারিত পর্যালোচনার পর তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে নাকচ করে দিয়েছে বিটিআরসি। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আমরা টেকনোলজিসের প্রস্তাবে বিটিআরসির সমুদয় পাওনা পরিশোধের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো অঙ্গীকার ছিল না। এ ছাড়া ৪৮টি মাসিক কিস্তি বা দীর্ঘমেয়াদি গ্রেস পিরিয়ডের প্রস্তাবটিকে কমিশন বাস্তবসম্মত বলে মনে করেনি, যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি অতীতেও কিস্তি পরিশোধের শর্ত ভঙ্গ করেছে।
কমিশন সভায় আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির ব্যান্ডউইথ বর্তমানে ১০০ শতাংশ ক্যাপিং অবস্থায় রয়েছে, যার ফলে তারা কার্যত নন-অপারেশনাল বা অকার্যকর অবস্থায় আছে। এ অবস্থায় আমরা টেকনোলজিসের আইআইজি লাইসেন্সটি আর বজায় রাখার কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পায়নি নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
এজন্য শেষ পর্যন্ত লাইসেন্স বাতিলের পথে হাঁটছে বিটিআরসি। কমিশনের সর্বশেষ সভা সূত্রে জানা গেছে, আমরা টেকনোলজিস আইআইজি গাইডলাইনের শর্ত ৮ দশমিক ০২ এবং লাইসেন্সের শর্ত ৪ দশমিক ০২ সরাসরি লঙ্ঘন করেছে। প্রতিষ্ঠানটিকে এর আগে একাধিকবার বকেয়া পরিশোধের জন্য কিস্তি সুবিধা দেওয়া হলেও তারা তা পরিপালনে ব্যর্থ হয়। মূলত রাজস্ব পরিশোধে এ দীর্ঘসূত্রতা এবং শর্ত ভঙ্গের কারণেই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিটিআরসি।
আমরা টেকনোলজিস লিমিটেডের লাইসেন্স বাতিলের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে কমিশন সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি কিস্তি পরিশোধ তথা দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ এবং কমিশনের পাওনা বকেয়া ২৮ কোটি ৩৯ লাখ ১৮ হাজার ৭২১ টাকার মধ্যে শুধু ১২ কোটি ১ লাখ ১৮ হাজার ৫২৭ টাকার ৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট এবং অবশিষ্ট বকেয়া ৪৮টি মাসিক কিস্তিতে পরিশোধের বিষয়ে উল্লেখ করলেও ওই প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের মেয়াদ আগামী আট মাসের মধ্যে শেষ হবে এবং কমিশনের সম্পূর্ণ বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে উল্লেখ না করায় প্রতিষ্ঠানটির বকেয়া পরিশোধ-সংক্রান্ত জবাব গ্রহণযোগ্য নয়।
এমন অবস্থায় আইআইজি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানটি কমিশনের নির্দেশনা, আইআইজি গাইডলাইনের শর্ত ৮ দশমিক ০২ এবং লাইসেন্সের শর্ত ৪ দশমিক ০২ লঙ্ঘন করা, একাধিকবার কিস্তি পরিশোধ তথা বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় আইআইজি গাইডলাইন ও লাইসেন্সের সংশ্লিষ্ট শর্ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির আইআইজি লাইসেন্স বাতিলের লক্ষ্যে সরকারের অনুমোদন নিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে চিঠি দেওয়া হবে। এ ছাড়া বিটিআরসির সমুদয় পাওনা বকেয়া আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করবে কমিশনের অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগ।
২০১২ সালে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় আমরা টেকনোলজিস লিমিটেড। ‘জেড’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৬৫ কোটি ৭০ লাখ ৭০ হাজার টাকা। সে হিসাবে কোম্পানিটির শেয়ার সংখ্যা ৬ কোটি ৪৭ লাখ ৭ হাজার ৪৪২ টাকা। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত শেষে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ৩০ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩২ দশমিক ০৬ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩৭ দশমকি ৯৩ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।



