পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরলে মিলবে অর্থনীতির নতুন গতি
আলমগীর হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে অর্থনৈতিক সাফল্য মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন অর্থনীতির ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, আর্থিক খাত কতটা স্থিতিশীল এবং বিনিয়োগ পরিবেশ কতটা আস্থাভিত্তিক তা বিবেচনা করা। তবে দেশের অর্থনীতি বর্তমানে নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অর্থনীতির গতি মন্থর করে দিয়েছে। এমন বাস্তবতায় অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের অভিন্ন মত হলো, শুধু ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের ওপর ভরসা করলে কাঙ্খিত শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ সম্ভব নয়।
ব্যাংক ও পুঁজিবাজারকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে পরিপূরক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও অবকাঠামো অর্থায়নের বড় অংশই আসে পুঁজিবাজার থেকে। অন্যদিকে বাংলাদেশে শিল্প উদ্যোক্তারা এখনো মূলত ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ব্যাংকিং খাতে চাপ বাড়ছে, ঋণের সুদহারও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
তবে দেশের পুঁজিবাজারকে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ও আস্থাহীনতার অবস্থা থেকে বের করে আনতে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানিয়েছেন, বাজার কারসাজি ও ইনসাইডার ট্রেডিং এবং সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অতীতের যেকোনও সময়ের তুলনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি কার্যকর, স্বচ্ছ, গভীর ও আস্থাভিত্তিক পুঁজিবাজার গড়ে উঠলে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ সহজ হবে, ব্যাংকের ওপর চাপ কমবে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নতুন গতি আসবে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে বড় বাধা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট। গত এক দশকে বাজারে কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুশাসনের ঘাটতি, নতুন কোম্পানির অভাব এবং নীতিগত অসামঞ্জস্যের কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
ফলে বাজারের ব্যপ্তি যেমন বাড়েনি, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগও প্রত্যাশিত মাত্রায় আসেনি। এ অবস্থায় বাজারকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নজরদারি জোরদার, করপোরেট গভর্ন্যান্স উন্নয়ন, ডিজিটাল তদারকি, নতুন পণ্য চালু এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ। একই সঙ্গে ভালো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে বিভিন্ন নীতিগত প্রণোদনার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্কার যথেষ্ট নয়। করনীতি, কোম্পানি আইন, সরকারি বন্ড বাজার, করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন ও বীমা তহবিলের অংশগ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে জবাবদিহি ও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার এই দুই খাতকেই সমানভাবে শক্তিশালী করতে হবে। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকঋণের পাশাপাশি একটি গভীর ও কার্যকর পুঁজিবাজার অপরিহার্য। সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, নীতিগত সংস্কার, ব্যবসা সহজীকরণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অর্থায়নের উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আস্থা প্রতিষ্ঠাই হবে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন কমিশনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। এ জন্য বাজার তদারকি আধুনিকীকরণ, কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিতকরণ এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার লেনদেনের বাজার হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য ভালো ও বড় কোম্পানিকে বাজারে আনতে কমিশন কাজ করছে।
ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেছেন, একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার ছাড়া টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব নয়। ফলে দেশীয় ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের আস্থা অর্জনের জন্য নীতির ধারাবাহিকতা, কর কাঠামোর স্থিতিশীলতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে করপোরেট বন্ড বাজার, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তিনি বলেন, বাজারে আস্থা ফিরলে দেশীয় সঞ্চয় উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে রূপ নেবে।



