তারল্য সংকটে এবি ব্যাংক পিডি লাইসেন্স ছাড়তে চায়
বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ হাজার ২৭০ কোটি টাকার চাহিদা ভিত্তিক ঋণ সুবিধা গ্রহণ এবং নতুন শর্তপূরণে অক্ষমতা জানিয়ে স্বেচ্ছায় প্রাইমারি ডিলার (পিডি) লাইসেন্স ছাড়ার আবেদন জানিয়েছে এবি ব্যাংক পিএলসি। অর্থ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজাউল ইসলামের স্বাক্ষরিত চিঠির সূত্রে বিষয়টি জানা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগেও চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
প্রাইমারি ডিলার বা পিডি লাইসেন্স হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকারের তরফ থেকে অনুমোদিত এমন একটি বিশেষ স্বীকৃতি, যার মাধ্যমে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি সিকিউরিটিজ যেমন ট্রেজারি বিল ও বন্ডের প্রাথমিক নিলামে সরাসরি অংশ নিতে এবং তা বাজারে কেনাবেচা করতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের নির্দেশক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক এই লাইসেন্স দিয়ে থাকে।
আগামী ১০ সেপ্টেম্বর প্রাইমারি ডিলার লাইসেন্স ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। ওই সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য অর্থ বিভাগের সচিবের কাছে আবেদন করা হয়েছে। তবে তারল্য সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলে ভবিষ্যতে আবারও এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব ব্যাংকটি ফিরে পাওয়ার আবেদন করবে বলে ব্যাংকটি জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ হাজার ২৭০ কোটি টাকার চাহিদাভিত্তিক ঋণ সুবিধা গ্রহণের পরও দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা, বাংলাদেশ ব্যাংকে চলতি হিসাবের নিম্ন স্থিতি এবং সংশোধিত প্রাইমারি ডিলার নির্দেশিকার শর্ত পূরণে অসুবিধাই এবি ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ। একইসঙ্গে ব্যাংকটি ভবিষ্যতের জন্যও একটি বার্তা দিয়েছে— বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলে আবারও প্রাইমারি ডিলারের দায়িত্ব পালনের সুযোগ ফিরে পেতে চায় তারা।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বরের এক চিঠির মাধ্যমে ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এবি ব্যাংককে প্রাইমারি ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেই নিয়োগের পর থেকে ব্যাংকটি সরকারি সিকিউরিটিজ বাজারের সম্প্রসারণ এবং একটি বিস্তৃত সরকারি সিকিউরিটিজ বাজার গড়ে তোলার লক্ষ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এসেছে।
তবে বর্তমানে ব্যাংকটি দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র তারল্য সংকটের মধ্যে রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ হাজার ২৭০ কোটি টাকার চাহিদাভিত্তিক ঋণ সুবিধা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সেই সহায়তা পাওয়ার পরও দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত চলতি হিসাবের নিম্ন স্থিতির কারণে প্রতিদিনের লেনদেন সম্পন্ন করতে ব্যাংকটিকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় ধারাবাহিক চাপ তৈরি হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, সম্প্রতি জারি করা সরকারি সিকিউরিটিজের প্রাইমারি ডিলারদের লাইসেন্স ও কার্যক্রম পরিচালনা নির্দেশিকা, ২০২৫ (সংশোধিত) অনুযায়ী বিদ্যমান আর্থিক অবস্থায় নির্দেশিকার শর্তগুলো পূরণ করা ব্যাংকটির জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমান আর্থিক অবস্থার কারণে সংশোধিত নির্দেশিকার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতেও নানা ধরনের জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে। গত ১২ মে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের ১ হাজার ৬৮তম সভায় প্রাইমারি ডিলার লাইসেন্স স্বেচ্ছায় ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের অনুলিপিও আবেদনপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।
পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের আলোকে অর্থ বিভাগের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রযোজ্য স্বেচ্ছায় অবসানের ধারার আওতায় আগামী ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকরভাবে প্রাইমারি ডিলার লাইসেন্স ত্যাগের অনুমতি দেওয়া হোক। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এদিকে চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমানের এই তারল্য সংকট অতিক্রম করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে আবারও প্রাইমারি ডিলার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ চাওয়া হবে। ব্যাংকটির ভাষায়, প্রাইমারি ডিলার হিসেবে দায়িত্ব পালন একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান এবং পরিস্থিতির উন্নতি হলে সেই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে পুনর্বহালের আবেদন জানানো হবে।
ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজাউল ইসলাম বলেন, প্রাইমারি ডিলার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তারা সরকারি সিকিউরিটিজ বাজারের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে। কিন্তু বর্তমান তারল্য পরিস্থিতি এবং নতুন নির্দেশিকার বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণেই স্বেচ্ছায় লাইসেন্স সমর্পণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে আমানত সংগ্রহ বাড়ানো এবং বকেয়া ও শ্রেণীকৃত ঋণ পুনরুদ্ধারে ব্যাপক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা চলছে।



