সরকারি বিল-বন্ডে ভর করেই অধিকাংশ ব্যাংকের মুনাফায় প্রবৃদ্ধি
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ ব্যাংকের মুনাফায় উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখা গেছে। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে করা বিনিয়োগ থেকে আয়, পাশাপাশি ফি ও কমিশনভিত্তিক আয়ও বেড়েছে যথেষ্ট। তবে এই ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে আরেকটি বাস্তবতাও স্পষ্ট খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়ায় বেশ কয়েকটি ব্যাংককে উচ্চ প্রভিশন সংস্থান করতে গিয়ে লোকসানের গভীরে তলিয়ে যেতে হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলক কম, ট্রেজারি সিকিউরিটিজ থেকে আয় বেশি, আমানত প্রবাহ স্থিতিশীল এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ভালো—এই সময়ে তারাই প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে ভালো ফল দেখাতে পেরেছে। বিপরীতে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি, তারা সেই ঋণের বিপরীতে সুদ আয় করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং একইসঙ্গে বাধ্য হয়েছে উচ্চ হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে—যা তাদের সামগ্রিক মুনাফায় সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার জানান, ব্যাংকগুলোর আর্থিক ফলাফলে সবচেয়ে বড় পার্থক্যকারী উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে খেলাপি ঋণ। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ তুলনামূলক কম, তারা উদ্বৃত্ত অর্থ নিরাপদে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে খাটাতে পেরেছে, যেখানে ঝুঁকি সামান্য এবং প্রভিশনের প্রয়োজনও পড়েনি। তাঁর ভাষ্যে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির গতি ধীর থাকায় অনেক ব্যাংক তাদের উদ্বৃত্ত তহবিল সরকারি সিকিউরিটিজে স্থানান্তর করে বাড়তি আয়ের সুযোগ কাজে লাগিয়েছে।
তবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের একজন সাবেক মহাপরিচালক এই পুরো চিত্রকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, নিয়ম-নীতি যথাযথভাবে মেনে চললে কোনো ব্যাংকেরই সংকটে পড়ার কথা নয়। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেখানে অনেক ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা আমানত সরিয়ে নিচ্ছেন, সেখানে কিছু ব্যাংকে উল্টো আমানত উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে—এমনকি কোনো কোনো ব্যাংক এখন নতুন আমানত নিতেও আগ্রহী নয়, বরং গ্রাহকরাই বলছেন সুদ না পেলেও চলবে, শুধু আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই যথেষ্ট। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যারা নিয়ম উপেক্ষা করে চলেছে, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ছত্রিশটি ব্যাংকের মধ্যে একত্রিশটি ব্যাংক চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বাকি পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেদন প্রকাশে অনিয়মিত রয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে সতেরোটির মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে, সাতটির মুনাফা কমেছে, ছয়টির লোকসান আরও বেড়েছে, আর একটি ব্যাংক মুনাফা থেকে সরাসরি লোকসানে চলে গেছে।
মুনাফার তালিকায় সবার শীর্ষে রয়েছে একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, যার নিট মুনাফা সাতান্ন শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার চারশ তেইশ কোটি টাকায়। এই সময়ে ব্যাংকটির নিট সুদ আয় ঊনত্রিশ শতাংশ বেড়ে হয়েছে এক হাজার ছাপ্পান্ন কোটি টাকা, আর বিনিয়োগ আয় পঁচিশ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার পাঁচশ ছাপ্পান্ন কোটি টাকায়।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতে শক্তিশালী অবস্থান, সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোবাইল আর্থিক সেবা থেকে বাড়তি আয় এবং তুলনামূলক কম খেলাপি ঋণ এই তিন কারণে ব্যাংকটির মুনাফা এতটা বেড়েছে। জুন শেষে এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার নেমে এসেছে দুই দশমিক শূন্য তিন শতাংশে, যা গত ডিসেম্বরে ছিল দুই দশমিক সাতাশ শতাংশ। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণ বিভাগের একজন প্রধান মনে করেন, কম খরচে আমানত সংগ্রহ এবং পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারার সক্ষমতাই এই ব্যাংকটিকে ধারাবাহিক ভালো ফল এনে দিচ্ছে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনকারী একটি ব্যাংকের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ছয়শ পঁচাশি কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ঊনিশ শতাংশ বেশি। এই ব্যাংকের নিট সুদ আয় প্রায় বিশ শতাংশ কমলেও বিনিয়োগ আয় চৌত্রিশ শতাংশ বেড়ে দুই হাজার তিরানব্বই কোটি টাকায় পৌঁছেছে, আর কমিশন-ব্রোকারেজ ও ফি-ভিত্তিক আয় বৃদ্ধিও মুনাফায় অবদান রেখেছে।
আরেকটি ব্যাংকের সমন্বিত নিট মুনাফা পঁচাত্তর শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচশ সাতাশ কোটি টাকায়, যেখানে বিনিয়োগ আয় পনেরো শতাংশ বেড়ে হয়েছে এক হাজার নয়শ দশ কোটি টাকা। এই সময়ে সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে একটি ব্যাংক, যার নিট মুনাফা তিনশ একুশ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে চারশ বিয়াল্লিশ কোটি টাকায়—যদিও নিট সুদ আয় একুশ শতাংশ কমেছে, তবে বিনিয়োগ আয় বাহান্ন শতাংশ বেড়ে এক হাজার চারশ বাইশ কোটি টাকায় পৌঁছানোয় এই বিশাল প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
একইভাবে আরেকটি ব্যাংকের নিট মুনাফা পঁচিশ শতাংশ বেড়ে চারশ ঊনচল্লিশ কোটি টাকা হয়েছে, যেখানে বিনিয়োগ আয় বেড়েছে বাহান্ন শতাংশ। অন্যদিকে একটি ব্যাংকের নিট মুনাফা ছয় শতাংশ বেড়ে চারশ তেত্রিশ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যার পেছনে সাতচল্লিশ শতাংশ বিনিয়োগ আয় বৃদ্ধির অবদান রয়েছে। এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি ব্যাংক আগের বছরের তুলনায় বেশি মুনাফা করেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে সব ব্যাংকের চিত্র একরকম নয়। বেশ কয়েকটি ব্যাংকের মুনাফা এই সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, আর দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা কয়েকটি ব্যাংকের লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে একটি বড় ইসলামি ধারার ব্যাংক—গত বছরের একই সময়ে যেখানে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল প্রায় সাতষট্টি কোটি টাকা, চলতি বছরে সেই ব্যাংকই সমন্বিতভাবে এক হাজার তিনশ ষোলো কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ভাষ্যে, আমানতের বিপরীতে ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আয় হ্রাস, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং অন্য ব্যাংকে রাখা তহবিল থেকে আয় কমে যাওয়াই এই বিশাল লোকসানের প্রধান কারণ।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা এই সার্বিক চিত্র নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে, ব্যাংকগুলো যে অভাবনীয় মুনাফা অর্জন করেছে, তার সিংহভাগই মূলত সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানত সরাসরি সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করে পাওয়া। এই কৌশল ব্যাংকের জন্য নিরাপদ হলেও তা ব্যাংকিং লাইসেন্স প্রদানের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কোনো ব্যবসায়িক মডেল হতে পারে না।
তাঁর ব্যাখ্যায়, আমানত বাড়লেও সেই অর্থ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না হয়ে সরকারি খাতে চলে যাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না, বাড়ছে না দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাতও। যদিও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ কোনো নিয়মবহির্ভূত কাজ নয়, তবে সামগ্রিক অর্থনীতির স্বার্থে এই প্রবণতা কাম্য নয় বলেই তাঁর অভিমত। তিনি আরও জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালাতেও এ বিষয়ে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবু নিরাপত্তার বিবেচনায় ব্যাংকগুলো ক্রমশ সরকারি বিল-বন্ডের দিকে ঝুঁকছে, যা স্বল্পমেয়াদে ভালো ফল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে না।
বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক আরও ব্যাখ্যা করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিটি ব্যাংকের জন্য আগে থেকেই নগদ রিজার্ভ অনুপাত ও সংবিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত নির্ধারণ করে দেয়। তাঁর মতে, ব্যাংকগুলো যদি এই নির্ধারিত সীমার মধ্যে থেকে আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণ করত, তাহলে সংকটে পড়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ব্যাংকই রিজার্ভের শর্ত উপেক্ষা করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করেছে।
নিয়ম অনুযায়ী একটি ব্যাংক তার মোট আমানতের সর্বোচ্চ পঁচাশি শতাংশ পর্যন্ত ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারে, অথচ কিছু ব্যাংক সেই সীমা ছাড়িয়ে শতভাগেরও বেশি ঋণ বিতরণ করে বসে আছে। তাঁর সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণ নিয়ম মেনে চললে কোনো ব্যাংকেরই আর্থিক সংকটে পড়ার কারণ নেই।
সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথমার্ধের চিত্র থেকে স্পষ্ট, দেশের ব্যাংক খাতে প্রকৃত ঋণ কার্যক্রম বা মূল ব্যবসায়িক আয়ের চেয়ে সরকারি সিকিউরিটিজ-নির্ভরতাই এখন মুনাফার প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকলে তা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যদিও স্বল্পমেয়াদে এটি ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনকে ঝকঝকে দেখাচ্ছে।



