আলমগীর হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের জীবন বিমা খাতে সামগ্রিকভাবে বেড়েছে ব্যবসা। তবে কয়েকটি কোম্পানির আর্থিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে উদ্বেগজনক অবনতি। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেষণে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ও জীবন তহবিল দুই ক্ষেত্রেই সংকোচন হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসার পাশাপাশি জীবন তহবিল কমার এ চিত্রকে ‘ক্যানসার আক্রান্ত’ বলছেন জীবন বিমা বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, কোনো কোম্পানির ব্যবসা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকা এবং একই সঙ্গে জীবন তহবিল কমে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়। এ ধরনের পরিস্থিতি অনেকটা শরীরে ক্যানসার বাসা বাঁধার মতো। শুরুতেই রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা করা না হলে তা পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একইভাবে বীমা কোম্পানিগুলোর সমস্যাও দ্রুত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো বীমা খাতে পড়বে।

ফলে জীবন বীমায় গ্রাহক যে প্রিমিয়াম জমা দেন, তার বড় অংশ ভবিষ্যতে দাবি পরিশোধ, বোনাস ও জীবন তহবিল (লাইফ ফান্ড) শক্তিশালী করার জন্য সংরক্ষিত থাকার কথা। কিন্তু সেই অর্থ থেকে আইনের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে লাগামহীন ব্যবস্থাপনা ব্যয় করছে দেশের বেশির ভাগ জীবন বীমা কোম্পানি।

এর মধ্যে জীবন বীমা খাতে দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকের দাবি পরিশোধে অনিয়ম ও ব্যবসায় মন্দা এবং আর্থিক দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এরই মধ্যে ব্যবসা ও জীবন বীমা তহবিল দুই সূচকেই ধারাবাহিক সংকোচনের চিত্র উঠে এসেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের আর্থিক প্রতিবেদনে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির মোট প্রিমিয়াম আয় কমেছে ১০৬ কোটি টাকার বেশি। একই সময়ে জীবন তহবিলও কমেছে প্রায় ২৯৪ কোটি টাকা।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২০ সালে দেশে ব্যবসা করা জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত ব্যবসা ছিল ৯ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ১০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সামগ্রিকভাবে এ খাতের ব্যবসা বেড়েছে তিন হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির বিপরীতে বেশ কয়েকটি কোম্পানি পিছিয়ে পড়েছে।

কোম্পানিটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ৩৮৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ২০২২ সালে সামান্য বেড়ে তা দাঁড়ায় ৩৯১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এর পর ২০২৩ সালে কমে ৩৮২ কোটি ৯৫ লাখ, ২০২৪ সালে ৩৩৬ কোটি ১০ লাখ এবং ২০২৫ সালে আরও কমে দাঁড়ায় ২৮২ কোটি টাকা।
বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে মেঘনা লাইফের জীবন তহবিল ছিল ১ হাজার ৮৬৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৯১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

২০২৩ সালে আরও কমে ১ হাজার ৬৭৫ কোটি ১০ লাখ, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৬০৫ কোটি ৪০ লাখ এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৫৭৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা হয়। জীবন বীমা কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও গ্রাহকের ভবিষ্যৎ দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে জীবন তহবিল গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এ তহবিল কমতে থাকায় কোম্পানিটির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

মেঘনা লাইফের ব্যবসায় পতনের অন্যতম কারণ নতুন পলিসি সংগ্রহে দুর্বলতা। কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রিমিয়াম আয় ছিল ৭৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

কোম্পানিটি তাদের প্রতিবেদনে প্রথম বছরের প্রিমিয়াম কমার পেছনে মূল্যস্ফীতির চাপ, মানুষের তারল্য সংকট এবং ভোক্তার আচরণ পরিবর্তনকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ পুরোনো পলিসির মেয়াদ ও দাবির বিপরীতে অর্থ পরিশোধ চললেও নতুন ব্যবসা থেকে পর্যাপ্ত প্রিমিয়াম আসছে না। এতে কোম্পানির তহবিলের ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মেঘনা লাইফের আর্থিক চিত্রে আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো বীমা দাবি পরিশোধের পরিমাণ। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দাবি পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৩৭৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২০ কোটি ৭৭ লাখ এবং ২০২৩ সালে ৪৪৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে দাবি পরিশোধের পরিমাণ কমে ৩৬৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং ২০২৫ সালে আরও কমে দাঁড়ায় ২৮৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।

তবে দাবি পরিশোধের অঙ্ক কমলেও কয়েক বছর তা মোট প্রিমিয়াম আয়ের চেয়ে বেশি ছিল। ২০২৩ সালে দাবি-প্রিমিয়াম অনুপাত দাঁড়ায় ১১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ২০২৪ সালেও এ অনুপাত ছিল ১০৮ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০২৫ সালেও একই চিত্র দেখা যায়। ওই বছর কোম্পানির মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ২৮২ কোটি টাকা, বিপরীতে বীমা দাবি পরিশোধের পরিমাণ ছিল ২৮৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ ২০২৫ সালেও শুধু ওই বছরের প্রিমিয়াম আয় দিয়ে দাবি পরিশোধের অঙ্ক মেটেনি। জীবন তহবিলের অন্যতম উৎস বিনিয়োগ আয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও কয়েক বছর ধরে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিনিয়োগ আয় ছিল ৯৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। ২০২১ সালে তা কমে ৮৯ কোটি ৭৬ লাখ, ২০২২ সালে ৮৫ কোটি ৭৯ লাখ এবং ২০২৩ সালে ৬৮ কোটি ৭২ লাখ টাকায় নেমে আসে। ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে বিনিয়োগ আয় দাঁড়ায় ৭৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক চাপ, বাড়তি দাবি পরিশোধের দায় এবং বাজারের অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগ আয়ে দুর্বলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে অবশ্য কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে মেঘনা লাইফের। ২০২১ সালে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা ব্যয় ছিল ১০৭ কোটি ১২ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। একই সময়ে কমিশন ব্যয়ও ৪৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা থেকে কমে ২৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। তবে ব্যয় কমলেও কোম্পানিটির মূল সূচকগুলোতে সংকট কাটেনি। প্রিমিয়াম আয়, নতুন ব্যবসা, বিনিয়োগ আয় এবং জীবন তহবিল—সব ক্ষেত্রেই কয়েক বছরের তুলনায় দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে।

জীবন বীমা কোম্পানির ব্যবসা ও জীবন তহবিলের ধারাবাহিক পতন শুধু আর্থিক সূচকের বিষয় নয়; এর সঙ্গে গ্রাহকের ভবিষ্যৎ দাবি পরিশোধের সক্ষমতাও জড়িত। নতুন ব্যবসা কমে যাওয়া এবং একই সময়ে পুরোনো পলিসির দাবি পরিশোধের চাপ অব্যাহত থাকলে কোম্পানির তহবিল ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হতে পারে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো জীবন বীমা কোম্পানির ব্যবসা ও জীবন তহবিল দীর্ঘ সময় ধরে কমতে থাকলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সময়মতো ঝুঁকি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মেঘনা লাইফের আর্থিক দুর্বলতার বিষয়ে জানতে চাইলে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) মুখপাত্র এবং মিডিয়া ও যোগাযোগ বিভাগের কর্মকর্তা আরমান বলেন, বর্তমানে চেয়ারম্যান সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন বীমা দাবি পরিশোধের বিষয়ে। তিনি বলেন, আইডিআরএর সব কার্যক্রম ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার কাজ চলছে। এটি সম্পন্ন হলে বীমা কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সহজে কাজ করা সম্ভব হবে। যেসব কোম্পানির প্রিমিয়াম ও জীবন তহবিল-সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে, সেগুলো নিয়েও কাজ করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও বিমা বিভাগের অধ্যাপক মো. মঈনুল ইসলাম বলেন, ব্যয়ের সীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্যই গ্রাহকের অর্থ সুরক্ষা। তাই ধারাবাহিকভাবে সীমা অতিক্রমকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

ব্যবসা কমে যাওয়ার প্রসঙ্গে মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বলেন, ব্যবসা কমার পেছনে শুধু কোম্পানির দুর্বলতা দায়ী নয়, বরং অতীতে প্রচলিত কিছু অনিয়মিত ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়াও এর অন্যতম কারণ। আগে কম্পিউটারাইজড ব্যবস্থা ছিল না। এখন হিসাব-নিকাশসহ বিভিন্ন কার্যক্রম প্রযুক্তিনির্ভর ও নিয়মতান্ত্রিক হওয়ায় অতীতে যেসব অননুমোদিত বা অনিয়মিত ব্যবসা হতো, সেগুলো অনেকটাই বন্ধ হয়েছে।

এছাড়া মেঘনা লাইফের প্রায় ৪শ থেকে ৫শ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে রয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে অর্থ আটকে আছে। ব্যাংকে আটকে থাকার কারণে প্রয়োজনের সময় এই অর্থ ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

এছাড়া বিভিন্ন লিজিং কোম্পানিতেও অর্থ আটকে রয়েছে। তুলনামূলক বেশি মুনাফার আশায় কিছু অর্থ লিজিং কোম্পানিতে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীসময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সংকটের কারণে সেই অর্থও আটকে গেছে।