আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও লুটপাট এবং অব্যবস্থাপনায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেড। দফায় দফায় গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় এখন অবসায়নের ঝুঁকিতে রয়েছে কোম্পানিটি। এছাড়া পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরে জীবন বীমা তহবিলে ঘাটতির পরিমাণ ৩১৯ কোটি টাকারও বেশি। এতে কোম্পানিটির ভবিষ্যতে টিকে থাকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক। কোম্পানিটির ২০২৫ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে এ মতামত দিয়েছেন তিনি।

নিরীক্ষকের প্রতিবেদন অনুসারে, কোম্পানিটির পদ্মা ওয়েলফেয়ার ফান্ড নামে যে সাদকা ফান্ড রয়েছে সেটিও উপযুক্ত প্রমাণ না থাকায় ফান্ডটি সম্পর্কে নিশ্চয়তা দিতে পারেনি নিরীক্ষক। এছাড়া পদ্মা লাইফ ২৭১ কোটি টাকারও বেশি জীবন বীমা দাবি এখনো পরিশোধ করেনি, যা নিয়মানুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করার বিধান রয়েছে। এ ধরনের বকেয়া দাবির বিপরীতে কোম্পানিটি কোনো ধরনের সঞ্চিতিও রাখেনি।

এছাড়া কোম্পানিটির ব্যাংক তহবিল সম্পর্কেও নিশ্চিত হতে পারেনি নিরীক্ষক। কোম্পানিটির একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দেয়া হয়নি। এছাড়া বাকি ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোতেও দীর্ঘদিন কোনো লেনদেন হয়নি । খতিয়ানের জের অনুযায়ী এসব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোট ৫ কোটি ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৮৭৬ টাকা জমা আছে। এছাড়া পদ্মা লাইফ জীবন বীমা দায় নিরূপণে অ্যাকচুয়ারিয়ার তদন্ত ও মূল্যায়নের বিধান থাকলেও তা সম্পন্ন করেনি। অন্যদিকে গ্র্যাচুইটি ফান্ড চুক্তির ক্ষেত্রে বার্ষিক নিরীক্ষিত প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক হলেও তা করেনি কোম্পানিটি। পাশাপাশি সম্পদ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্থগিত করের বিধানও মানেনি পদ্মা লাইফ।

আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৪ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো লভ্যাংশ সুপারিশ করেনি পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পর্ষদ। ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৩ হিসাব বছরেও বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি কোম্পানিটি। ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০১৭ থেকে ২০২২ পর্যন্তও কোনো লভ্যাংশ পাননি কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডাররা। ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০১৬ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের ২০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল পদ্মা লাইফ।

২০১২ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অনুমোদিত মূলধন ১০০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ৩৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। কোম্পানিটির মোট শেয়ার সংখ্যা ৩ কোটি ৮৮ লাখ ৮০ হাজার। এর ৩১ দশমিক ৫৬ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ১৭ দশমিক ৭৯ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ৫০ দশমিক ৬৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে প্রায় ১২ লাখ গ্রাহকের ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকার বেশি বীমা দাবি বকেয়া ছিল। বীমা খাতের জন্য যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতি বছরই বকেয়া বীমা দাবির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এরমধ্যেই পূর্বের কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার-অ্যাক্টিং) হিসেবে মো. মোস্তাফিদুজ্জামানকে নিয়োগ দিয়েছে কোম্পানিটি। এ বিষয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে চিঠি দিয়েছে পদ্মা লাইফ।

চলতি বছরের ২১ মে থেকে তিনি এ পদে দায়িত্বরত আছেন। প্রায় দুইমাস পেরিয়ে গেলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আইডিআরএ। তথ্যমতে, মো. মোস্তাফিদুজ্জামান এস আলম গ্রুপের খুব কাছের মানুষ। এমনকি বীমা খাতের কোনো কোম্পানিতে তিনি কখনো কাজ করেননি। এ পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞতা না থাকা কাউকে এ খাতে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা লাইফ বর্তমানে আর্থিক সংকট ও নানা অনিয়মে জর্জরিত। তাদের মতে, দক্ষ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের পরিবর্তে অদক্ষ ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার অর্থ হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠার বদলে আগের অনিয়ম ও দুর্বলতা এবং লুটপাটের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেওয়া।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন বীমা দাবি নিষ্পত্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সব ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনার পরও প্রয়োজন হলে সরকারের কাছে ওয়ান-টাইম (এককালীন) বেইল আউট প্যাকেজের প্রস্তাবও দেওয়া হতে পারে।