পুঁজিবাজারে ‘স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল’ কারসাজির বিচার হয়নি আজও
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে কারসাজি ও জালিয়াতির দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ২০১৪ সালে গঠিত হয়েছিল ‘স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল’। এই ট্রাইব্যুনাল গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা এবং বাজারের অপরাধীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় এনে একটি জবাবদিহিমূলক পরিবেশ তৈরি করা। তবে প্রতিষ্ঠার এক দশক পেরিয়ে গেলেও ট্রাইব্যুনাল তার কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। বর্তমানে মাত্র তিনটি মামলা চলমান রয়েছে এই বিশেষায়িত আদালতে।
জানা গেছে, গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে নামমাত্র কিছু মামলার নিষ্পত্তি হলেও অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ মামলাই উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ এবং আইনি মারপ্যাঁচে আটকে রয়েছে। গঠনের পর থেকে বর্তমানে মাত্র তিনটি মামলার বিচারিক কার্যক্রম সচল থাকায় সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হলেও এই আদালতের ফলাফল দৃশ্যমান হচ্ছে না।
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এ পর্যন্ত ২৮টি মামলা এই আদালতে এলেও এর মধ্যে ১১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, ১০টি স্থগিত, দুটি বাতিল, দুটি এখতিয়ার বহির্ভূত এবং তিনটি মামলা চলমান রয়েছে।
এই মামলাগুলোর মধ্যে চিক টেক্স লিমিটেড, প্রিমিয়াম সিকিউরিটিজ লিমিটেড, বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডস লিমিটেড, সান্তারুজ্জামান শামীমের মামলা, মেসার্স এইচএমএমএস ফাইন্যান্সিয়াল কনসালটেন্সি অ্যান্ড সিকিউরিটিজ, মাহবুবুর সরওয়ারের মামলা, চিটাগাং সিমেন্ট ক্লিংকার গ্রাইন্ডিং কোম্পানি লিমিটেড, মো. কুতুবউদ্দিন (সৌদি বাংলাদেশ হ্যান্ডা অ্যান্ড এগ্রিকালচার ইনভেস্টমেন্ট কো.), সিকিউরিটিজ কনসালটেন্টস লিমিটেড, সিকিউরিটিজ প্রমোশন অ্যান্ড লিমিটেড এবং মার্ক বাংলাদেশ শিল্প অ্যান্ড ইঞ্জি. লিমিটেডের মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে।
এদিকে সালটা ক্যাপিটাল লিমিটেড, ইমতিয়াজ হোসেন অ্যান্ড কোম্পানি, ফার্স্ট ক্যাপিটাল সিকিউরিটিজ, দোহা সিকিউরিটিজ, অলিম্পিক ইন্ডা. লিমিটেড, ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েস লিমিটেড, প্যারাগন লেদার অ্যান্ড ফুটওয়্যার ইন্ডা. লিমিটেড, সৈয়দ সিরাজউদ্দৌলা গং, সুহৃদ ইন্ডা. লিমিটেড ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের মামলা উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে।
সেই সময় ক্ষমতার দাপটে আলোচিত শাইনপুকুর হোল্ডিং লিমিটেড এবং সালমান এফ রহমানের নামে থাকা দুটি মামলা বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে কে. এইচ. কেমিক্যাল ইন্ডা. লিমিটেড ও তানলিন মাশফের মামলা দুটি বিচারিক এখতিয়ার বহির্ভূত হওয়ার বাতিল করা হয়।
বর্তমানে আমান সী ফুডস ইন্ডা. লিমিটেড; অ্যাপেক্স ফুডস লিমিটেড এবং টি. কে অয়েল রিফাইনারি কোম্পানি লিমিটেডের মামলা পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এ পর্যন্ত ২৮টি মামলা এই আদালতে এলেও এর মধ্যে ১১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, ১০টি স্থগিত, দুটি বাতিল, দুটি এখতিয়ার বহির্ভূত এবং তিনটি মামলা চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ট্রাইব্যুনালের গতিহীনতার প্রধান কারণ আসামিপক্ষের উচ্চ আদালতে রিট করা। বিএসইসি কর্তৃক দায়ের করা মামলার বিপরীতে আসামিরা সহজেই উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসছেন, যার ফলে বছরের পর বছর নিম্ন আদালতের বিচার কাজ বন্ধ থাকছে। শুধু তাই নয়, নিয়মিত আদালত থেকে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতির। অনেক সময় নথিপত্র চালাচালি এবং আইনি ব্যাখ্যার গ্যাঁড়াকলে পড়ে বছরের পর বছর সময় পার হয়ে যায় বলে মনে করেন তারা।
পুঁজিবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুটি কেলেঙ্কারি ১৯৯৬ সাল এবং ২০১০ সালের। শেয়ার কেলেঙ্কারির কারণে হওয়া ওই দুই ধসের পেছনে জড়িত মূল কারসাজিকারীদের বিচার দ্রুত করার লক্ষ্যেই এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ১৯৯৬ সালের কারসাজির বেশ কিছু মামলা এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি কিংবা উচ্চ আদালতের আদেশে ঝুলে আছে। একই সঙ্গে ২০১০ সালের ধসের পর গঠিত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে যে মামলাগুলো হয়েছিল, তারও একটি বড় অংশ আইনি জটিলতায় আটকা পড়েছে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট মামলার সংখ্যা ৫ শতাধিক হলেও দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে মাত্র তিনটি মামলা চলমান থাকার অর্থ হলো, পুঁজিবাজারের কোটি কোটি টাকা লুটে নেওয়া অপরাধীরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি উপভোগ করছে, আর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারিয়ে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, একটি গতিশীল পুঁজিবাজারের জন্য কঠোর আইনি প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। শুধু ট্রাইব্যুনাল গঠন করলেই বিচার হয় না। বিএসইসিকে মামলার আইনি ভিত্তি মজবুত করতে হবে, যেন আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে গিয়ে সহজেই স্থগিতাদেশ না পায়। একইসঙ্গে উচ্চ আদালতেও এই বিশেষ মামলার জন্য ডেডিকেটেড বেঞ্চ বা দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করা দরকার বলে তারা মনে করেন।
অন্যদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সংগঠনগুলোর দাবি, ট্রাইব্যুনাল যদি বছরের পর বছর মাত্র তিনটি মামলা নিয়ে পড়ে থাকে, তবে কারসাজিকারীরা আরও উৎসাহিত হবে, যা বাজারের বর্তমান আস্থা সংকট আরও বাড়িয়ে তুলবে। তবে বিএসইসির আইনি উইংকে শক্তিশালী করে উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা স্থগিতাদেশগুলো সরাতে জরুরি আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক সময়ে বিএসইসি যে নতুন নিয়ম ও সংস্কারের দিকে হাঁটছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়াকেও আধুনিকায়ন করতে হবে বলে মনে করেন সাধারণ বিনিয়োগকারী মশিউর রহমান।
তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালকে গতিশীল করতে বিএসইসিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে এবং নতুন আইপিও ও ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়িয়ে বাজারের গভীরতা বাড়াতে হলে সবার আগে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হবে। আর সেই আস্থার মূল ভিত্তি হলো অপরাধের দ্রুত বিচার। এক দশকে মাত্র তিনটি মামলা চলমান থাকার এই ‘খুড়িয়ে চলা’ সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে বলে মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়রম্যান মাসুদ খান বলেন, পুঁজিবাজারে বিভিন্ন অনিয়মের শাস্তিস্বরূপ যখনই বিএসইসি কোনো জরিমানা আরোপ করেছে কিংবা কোনো অনিয়মের কারণে কারও লাইসেন্স বাতিল করেছে, তখনই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো তাদের মৌলিক অধিকারের দোহাই দিয়ে মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করছেন। আগেও আমি এই প্রবণতা লক্ষ্য করেছি।
এই আইনি জটিলতা নিরসনে আমরা গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করেছি এবং টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছি। প্রথমত, হাইকোর্টে পুঁজিবাজার সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আমরা একটি স্পেশাল বেঞ্চ গঠনের উদ্যোগ নেব। আমি অত্যন্ত আশাবাদী যে, হাইকোর্টে এই বিশেষ বেঞ্চটি আমরা খুব দ্রুতই গঠন করতে পারব। দ্বিতীয়ত, সাধারণত কোনো পক্ষ যখন রিট ফাইল করেন, তখন প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মহামান্য আদালতের একটি বিষয় খতিয়ে দেখার কথা তা হলো, রিট করার আগে সংক্ষুব্ধ পক্ষ আইনানুযায়ী কোনো বিকল্প প্রতিকারের আশ্রয় নিয়েছিল কি না।
দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমানে এই চর্চাটি যথাযথভাবে হচ্ছে না এবং আমাদের আইনজীবীরাও আদালতে এই প্রশ্নটি জোরালোভাবে তুলছেন না। এখন থেকে আমরা এটি কঠোরভাবে নিশ্চিত করব, যাতে যেকোনো রিট আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা ঢালাওভাবে গ্রহণ না করা হয়। তৃতীয়ত, আমাদের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল থাকা সত্ত্বেও সেটি দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা নিষ্ক্রিয় ও অকার্যকর হয়ে রয়েছে।
আমরা এর পেছনের দুটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছি যে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী এই ট্রাইব্যুনাল সরাসরি মামলার আমলে নিতে পারে না। ফলে প্রথমে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করতে হয় এবং পরবর্তীতে তা ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়। এই দীর্ঘসূত্রতা ভাঙতে হলে আমাদের সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করতে হবে এবং আমরা সেই দিকেই যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারে বড় ধরনের কোনো জালিয়াতি বা আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রে কেবল দেওয়ানি মামলা করে কোনো সুফল পাওয়া যায় না। এ ধরনের জালিয়াতি রোধে কঠোর ফৌজদারি ব্যবস্থার প্রয়োজন। তাই আমরা আমাদের বিদ্যমান আইনগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করছি। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, পুঁজিবাজারে জালিয়াতি ও কারসাজির বিরুদ্ধে এখন থেকে আর শুধু দেওয়ানি মামলা নয়,
বরং আমাদের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সরাসরি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে। আগামীতে আপনারা এর বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাবেন। পুঁজিবাজারে সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমরা এই সংস্কারমূলক চিন্তাগুলো করেছি, কারণ শক্ত পদক্ষেপ না নিলে বাজারের কাঙ্ক্ষিত গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
২০১০ সালে পুঁজিবাজারে বিপর্যয়ের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ কমিটির প্রতিবেদনে পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল গঠনের সুপারিশ করা হয়েছিল। ২০১২ সালের ১০ ডিসেম্বর সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯ সংশোধন করে সরকার সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ আইন, ২০১২ প্রণয়ন করে।
সংশোধিত আইনের ২৫ (বি) ধারায় বলা হয়েছে, ‘আইনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সরকার এক বা একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারবে।’ ওই ধারা অনুযায়ীই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ১৭টি মামলা নিয়ে ২০১৫ সালের ২১ জুন পুঁজিবাজার বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম শুরু করেন বিচারক হুমায়ুন কবির (বিশেষ জজ)। পরে এই ট্রাইব্যুনালের মামলা সংখ্যা বেড়ে ২৮টিতে উন্নীত হয়। যার মধ্যে এখন চলমান রয়েছে মাত্র তিনটি মামলা।



