দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: একীভূত করা পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের বিনিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়ম তদন্তে বিশেষ ফরেনসিক অডিট চলছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, অডিট প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনিয়মে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের নিয়োগ বাতিলসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোববার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলামের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ঋণ জালিয়াতি ও আর্থিক অনিয়ম রোধে সরকার একটি সুসংগঠিত রেজল্যুশন কাঠামো বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে।

লিখিত প্রশ্নে এমপি নূরুল ইসলাম জানতে চান, বিগত সরকারের আমলে সীমাহীন লুটপাট, বেনামি ঋণ জালিয়াতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ও বেসরকারি ব্যাংকে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারের পদক্ষেপ কী?

জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি সুসংগঠিত ও বহুমাত্রিক রেজল্যুশন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। এ কাঠামোর আইনি ভিত্তি হিসেবে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’।

তিনি জানান, এই আইনের আওতায় এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ (এক্সিম ব্যাংক), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক এই পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। এটি সরকারের রেজল্যুশন কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

অর্থমন্ত্রী বলেন, একীভূতকরণের ফলে পাঁচটি ব্যাংকের সব আমানতকারীর দাবি ও স্বার্থ নতুন ব্যাংকের মাধ্যমে সুরক্ষিত হয়েছে। একই সঙ্গে ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ অনুযায়ী, সুরক্ষিত আমানতের সর্বোচ্চ সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় অবসায়নাধীন ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজল্যুশন স্কিম অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে তাদের অর্থ ফেরত পাচ্ছেন। আগে আমানত সুরক্ষা আইনের আওতায় না থাকা ফাইন্যান্স কোম্পানির আমানতকারীদেরও এখন এই সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক মূলত আমানতকারীদের অর্থে পরিচালিত হয়। তাই আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা পরিচালনা পর্ষদের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ঋণ ও বিনিয়োগ সুবিধা গ্রহণ এবং ব্যাংক ও আমানতকারীদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এর ফলে আমানতকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয় এবং পুরো ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা দেখা দেয়।

এ পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের শেষ দিকে ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত)-এর ৪৭(১) ও ৪৮(১) ধারার ক্ষমতাবলে ১১টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে আইনের ৪৫ ধারার আওতায়, বাংলাদেশ ব্যাংক মনোনীত পরিচালক ও স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়।

অর্থমন্ত্রী জানান, পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মার্চ, আগস্ট ও ডিসেম্বর মাসে আরও পাঁচটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।