পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্সের তহবিল ঘাটতি ৩১৯ কোটি টাকা
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি পদ্মা ইসলামি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের বিপুল পরিমাণ অঙ্কের নেতিবাচক বিমা তহবিল ও গ্রাহকের ২০০ কোটি টাকার বেশি বকেয়া দাবি পরিশোধ না করা এবং আর্থিক বিবরণীতে নানা অনিয়মের কারণে অস্তিত্ব ও নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনা সক্ষমতা (গোয়িং কনসার্ন) নিয়ে মারাত্মক সংশয় প্রকাশ করেছে নিরীক্ষক।
সমাপ্ত ২০২৫ হিসাববছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে কোম্পানিটির নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান (সিএ ফার্ম) এ সংক্রান্ত ‘কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন’ দিয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রকাশিত নিরীক্ষকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, পদ্মা ইসলামি লাইফের আর্থিক প্রতিবেদনে অন্তত সাতটি বড় ধরনের অনিয়ম ও অসঙ্গতি চিহ্নিত করেছেন নিরীক্ষক।
কোম্পানির লাইফ ইন্স্যুরেন্স ফান্ডের (লাইফ ফান্ড) অবস্থা অত্যন্ত করুণ। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে প্রতিষ্ঠানটির লাইফ ফান্ডের পুঞ্জীভূত ঘাটতি বা ঋণাত্মক স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩১৯ কোটি ৩১ লাখ ৩২ হাজার ৮৫৩ টাকায়। আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সাল শেষেও এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২৯১ কোটি ৯২ লাখ ২৪ হাজার ৬২৭ টাকা। এক বছরেই এই তহবিলের ঘাটতি বেড়েছে আরও ২৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। নিরীক্ষকের মতে, বিমা তহবিলের এই বিশাল অঙ্কের নেতিবাচক স্থিতি কোম্পানিটির ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।
বিমা আইন ২০১০-এর ৭২ ধারা অনুযায়ী বিমা দাবি উত্থাপনের ৯০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা থাকলেও পদ্মা ইসলামি লাইফ তা মানেনি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেয়াদোত্তীর্ণ ও বিমা দাবি বাবদ মোট ২৭১ কোটি ১০ লাখ ৯৭ হাজার ৬৮৭ টাকা গ্রাহকদের পরিশোধ করা হয়নি। এর মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ দাবি ২৫১ কোটি ১৩ লাখ টাকা এবং সারভাইভাল বেনিফিট ১৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। আইন অনুযায়ী এসব বকেয়া দাবির ওপর কোনো সুদের সংস্থান বা প্রোভিশনও রাখেনি কোম্পানিটি।
কোম্পানির নগদ ও ব্যাংক হিসাবের তথ্যেও জালিয়াতি ও গরমিলের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। নিরীক্ষক জানিয়েছেন, একটি ব্যাংকের স্টেটমেন্ট সরবরাহ করেনি কোম্পানিটি। এ ছাড়া ১৬২টি ব্যাংক হিসাবে দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না থাকলেও লেজার বা খতিয়ান খাতায় ৫ কোটি ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৮৭৬ টাকার স্থিতি দেখানো হয়েছে, যা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় নির্ধারণে আকচুয়ারিয়াল মূল্যায়ন বা তদন্ত বাধ্যতামূলক হলেও পদ্মা ইসলামি লাইফ তা পরিচালনা করেনি। অন্যদিকে, ‘সাদাকা ফান্ড’ (পদ্মা ওয়েলফেয়ার ফান্ড) নামে দেখানো ৪ কোটি ৩৪ লাখ ২২ হাজার ১৩২ টাকার কোনো উপযুক্ত প্রমাণ বা নথি নিরীক্ষকের কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া গ্র্যাচ্যুয়িটি ফান্ডের চুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর বাধ্যতামূলক নিরীক্ষা করার কথা থাকলেও তা না করেই তহবিল থেকে অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। সম্পদ পুনর্মূল্যায়নের ওপর আন্তর্জাতিক হিসাবমান-১২ অনুযায়ী ডেফার্ড ট্যাক্স বা বিলম্বিত কর হিসাবভুক্ত না করার বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন নিরীক্ষক।
এদিকে সম্প্রতি সমাপ্ত ২০২৫ হিসাববছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ার (নো ডিভিডেন্ড) সুপারিশ করেছে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ। বার্ষিক প্রতিবেদন ও অন্যান্য এজেন্ডা অনুমোদনের জন্য আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টায় রাজধানীর বাংলামোটরের পদ্মা লাইফ টাওয়ারের শীর্ষ তলায় কোম্পানিটির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) অনুষ্ঠিত হবে। এর জন্য রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ আগস্ট।
আর্থিক সংকটের মধ্যেই চলতি ২০২৬ হিসাববছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কোম্পানিটি। তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে কোম্পানির মোট আয় হয়েছে ৫ কোটি ১৬ লাখ ৯৭ হাজার টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ কোটি ৩২ লাখ ৯০ হাজার টাকা। তবে আয় বাড়লেও প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির খরচ দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩৯ হাজার টাকায়।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাস শেষে (৩১ মার্চ ২০২৬) কোম্পানিটির বিমা তহবিলের ঋণাত্মক স্থিতি বা ঘাটতি আরও বেড়ে ৩২৩ কোটি ৬৩ লাখ ৭৫ হাজার ২৬৮ টাকায় পৌঁছেছে, যা ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে ছিল ৩১৯ কোটি ৩১ লাখ ৩২ হাজার ৮৫৩ টাকা।



