বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা আনা ও বন্ড বাজারকে আরও শক্তিশালী কার্যকর করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে সরকার। ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে পুঁজিবাজারকে আরও গভীর ও বৈচিত্র্যময় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বন্ড ইস্যু ও পুঁজিবাজার উন্নয়নে নীতি ও কৌশল এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ তৈরির জন্য আট সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।

মুলত বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনির নেতৃত্বে এ কমিটিতে দেশের শীর্ষ অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরকারি ঋণ নীতি ও আর্থিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে গঠিত এ কমিটি পুঁজিবাজার উন্নয়ন, বন্ড ইস্যু, নতুন আর্থিক উপকরণ চালু ও বাজারসংক্রান্ত নীতি নিয়ে কাজ করবে।

বন্ড ইস্যুর পুরো প্রক্রিয়া তদারকির দায়িত্বও পেয়েছে এ কমিটি। সরকারি ঋণ নীতি ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনা অধিশাখার উপসচিব ফরিদ আহমেদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তথ্য জানা গেছে। চিঠিতে কমিটির গঠন, সদস্য, দায়িত্ব এবং কর্মপরিধি বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি বিশেষজ্ঞ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের কমিটির কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজারসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় সমন্বিতভাবে নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের পাশাপাশি ঋণপত্রভিত্তিক অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে শক্তিশালী বন্ড বাজার গড়ে তোলা জরুরি। একইসঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পুঁজিবাজারে কার্যকর নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। তাদের মতে, সরকারের নতুন এই উচ্চপর্যায়ের কমিটি পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজারের উন্নয়নে একটি সমন্বিত কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। নির্ধারিত দায়িত্বগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজার ও ঋণপত্র বাজারে নতুন গতি আসতে পারে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

চিঠি অনুযায়ী, উচ্চপর্যায়ের এ কমিটিতে অর্থ বিভাগের টিডিএম ও সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব, সরকারি ঋণ ও আর্থিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব অথবা যুগ্মসচিব, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের একজন যুগ্ম সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন যুগ্ম সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের দুজন প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের একজন প্রতিনিধিকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। সরকারি ঋণ নীতি ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনা অধিশাখার যুগ্ম সচিব অথবা উপসচিব সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

চিঠিতে আরও বলা হয়, প্রয়োজনে সরকারি কর্মকর্তা কিংবা বেসরকারি বিশেষজ্ঞদেরও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। এতে প্রয়োজন অনুযায়ী অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার সমন্বয় ঘটানোর সুযোগ থাকবে। নতুন কমিটির দায়িত্ব কেবল সুপারিশ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুঁজিবাজার উন্নয়ন এবং বন্ড ইস্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি, কৌশল ও সমন্বয় নিশ্চিত করাও কমিটির দায়িত্বের মধ্যে রাখা হয়েছে।

দেশের পুঁজিবাজারের সার্বিক উন্নয়ন, সম্প্রসারণ এবং বড় ইক্যুইটি বাজার গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে কমিটি। পাশাপাশি এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগও নেবে। লক্ষ্য থাকবে বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো এবং একটি কার্যকর ও স্থিতিশীল বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা। কমিটির অন্যতম বড় দায়িত্ব হচ্ছে দেশের ঋণপত্র বাজারকে সক্রিয় ও শক্তিশালী করা। সরকারি সিকিউরিটিজ, করপোরেট বন্ড, সবুজ বন্ড, অন্যান্য বন্ড এবং ঋণপত্রের বাজার উন্নয়ন, বাজারে সমন্বয় সৃষ্টি, কেনাবেচা সহজ করা এবং বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কমিটি।

বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে কত অর্থ সংগ্রহ করা হবে, কোন মুদ্রায় ইস্যু হবে, মেয়াদ কত হবে, সুদের হার কী হবে, কোন বাজারে ইস্যু করা হবে এবং কোন পদ্ধতিতে তা সম্পন্ন হবে এসব আর্থিক ও কারিগরি বিষয়ও কমিটির তদারকির আওতায় থাকবে। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিনিয়োগ ও তহবিল সংগ্রহের বিষয়েও কাজ করবে কমিটি। এ জন্য ইক্যুইটি বাজারের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া, বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা, বাজারব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করা এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তহবিল সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সুপারিশ করবে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের বাইরে থাকা পুঁজিবাজার প্রতিনিধি, পেনশন তহবিল, বিমা কোম্পানি, মিউচুয়াল তহবিল, প্রাইভেট ইক্যুইটি এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে।

বন্ড ইস্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফারিং সার্কুলার, তথ্য স্মারক, যথাযথ যাচাই-বাছাই, ঋণমান নির্ধারণ, রোডশো, বিনিয়োগকারী উপস্থাপনা, বিনিয়োগকারী সম্পৃক্তকরণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি ও কার্যক্রমে সুপারিশ ও সমন্বয়ের দায়িত্বও কমিটির ওপর দেওয়া হয়েছে।