তিন লাখ ফেরত নেওয়ার প্রস্তাবও রোহিঙ্গাদের কাছে ‘নাটক’
দেশ প্রতিক্ষণ, কক্সবাজার: বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে তিন লাখের কিছু বেশি মানুষকে ফেরত নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে মায়ানমার যে নতুন বিবৃতি দিয়েছে, সেটিকে ‘নাটক’ বলে অভিহিত করেছেন রোহিঙ্গা নেতারা। তাদের আশঙ্কা, রোহিঙ্গাদের পরিচয় অস্বীকার, ফেরত যাওয়ার ক্ষেত্রে নানা শর্ত এবং যাচাই-বাছাইয়ের নামে জটিলতা তৈরি করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার পথ তৈরি করছে মায়ানমার।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’-এর অন্যতম শীর্ষ নেতা ডা. মোহাম্মদ জোবায়ের নিউজ পত্রিকাকে বলেন, মায়ানমার প্রত্যাবাসন নিয়ে যে ধরনের বক্তব্য ও শর্ত দিচ্ছে, তাতে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থার সংকট আরও গভীর হচ্ছে। আরাকানে শান্তি প্রতিষ্ঠার শর্তকে সামনে রেখে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। কারণ, সেখানে চলমান সংঘাতের কারণে সহসা স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাইয়ের তালিকা মায়ানমার ও রোহিঙ্গাদের কাছে রয়েছে। ওই তালিকার ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের দাবিগুলো বিবেচনায় নিয়ে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কিন্তু কঠিন ও অস্পষ্ট শর্ত আরোপ করে প্রত্যাবাসন নিয়ে মায়ানমারের সাম্প্রতিক অবস্থানকে তিনি মূলত লোক দেখানো উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
ডা. জোবায়েরের আশঙ্কা করে বলেন, নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত না করে রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে ফেরত পাঠানো হলে তারা আবারও গুরুতর নিপীড়নের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তাই প্রত্যাবাসনের আগে তাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও পরিচয়ের বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা থাকা জরুরি।
রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়েও মায়ানমারের অবস্থানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা নিজেদের জাতিগত পরিচয়কে রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। অথচ মায়ানমার তাদেরকে ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করার অবস্থানে রয়েছে, যা রোহিঙ্গাদের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ কারণে মায়ানমারের বিবৃতিতে প্রত্যাবাসনের আগ্রহ প্রকাশ করা হলেও বাস্তবে তারা রোহিঙ্গাদের কতটা গ্রহণ করতে প্রস্তুত, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মায়ানমার এসব বিবৃতি দিয়ে রোহিঙ্গাদেরকে গ্রহণ না করার জন্য ‘নাটক’ করতেছে। তারা রোহিঙ্গাদের পরিচয় অস্বীকার করে এবং ফেরত যাওয়ার ক্ষেত্রে নানা রকম কঠিন শর্ত জুড়ে দিচ্ছে, যাতে কার্যত প্রত্যাবাসন না হয়। রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা নুরুল আমিন বলেন, মায়ানমারের বিবৃতিতে প্রত্যাবাসনের কথা বললেও এমন কিছু শর্ত ও ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিত করে দেয়। ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাদের মধ্যে মাত্র তিন লাখ নেবে, বাকিদের দায়িত্ব কে নেবে?
উখিয়া থাইংখালী ১৯ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হেড মাঝি শামশুল আলম বলেন, আমাদের স্বীকৃতি দেয়নি বলে এ দেশে পালিয়ে আসতে হয়েছে। এখন যদি স্বীকৃতি না দিয়ে ৩ লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে যায়, তবে তাদের নিরাপত্তা কোথায়? ঠিক আগের মতো গণহত্যা করলে দায় কে নেবে, রোহিঙ্গারা এ চিন্তা করছেন। আমাদের দাবি মেনে স্বীকৃতি না দিলে আমরা মায়ানমারে যাব না।
গত শনিবার মায়ানমানের জান্তা সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রায় তিন লাখের বেশি মানুষ দেশটির রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা। রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে তারা প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে দেশে ফেরত নিতে ইচ্ছুক। ২০১৭ সালের আগস্টে সামরিক বাহিনীর নির্যাতনে বাস্তুচ্যুত হয়ে রোহিঙ্গারা মায়ানমার ছাড়তে বাধ্য হয়। সেই ‘রোহিঙ্গা ঢলের’ নয় বছর পূর্ণ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে মায়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ বিবৃতি এল। তবে বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী মায়ানমারে নেই।
মায়ানমারের দাবি, বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। আর ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে দেশটি।
শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ.ন.ম হেলাল উদ্দিন বলেন, মায়ানমার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলেও তাদের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে এমন কিছু শর্ত ও বক্তব্য রয়েছে, যা বাস্তবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
তিনি বলেন, তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যায়। তবে এই সংখ্যাকে যেন চূড়ান্ত সীমা হিসেবে বিবেচনা করা না হয়। মায়ানমার যদি নির্দিষ্ট সংখ্যক রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার পর অন্যদের প্রত্যাবাসনের সুযোগ না রাখে তাহলে বিষয়টি কঠিন হয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, মায়ানমারে ফিরে যাওয়ার পর তাদের নিরাপত্তা ও জীবন রক্ষার নিশ্চয়তার ব্যাপারে স্পষ্ট বক্তব্য থাকা দরকার। তারা সেখানে সম্মান ও মানবিক মর্যাদা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে কি না এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা ছাড়া প্রত্যাবাসন কার্যকর করা কঠিন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, মায়ানমার কোন ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে দাবি করছে, তা আমাদের জানা নেই। এটা একান্ত তাদের সংজ্ঞা। আমরা জানি রোহিঙ্গারা তাদের নিজেদেরকে বাঙালি মনে করেন না।
মিজানুর রহমান বলেন, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৮ লাখ ২৪ হাজার রোহিঙ্গার তথ্য মায়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছিল। সেই জনগোষ্ঠীর পরিবার ও সদস্য সংখ্যা পরবর্তী সময়ে বেড়েছে। এখন ১২ লাখের উপরে রোহিঙ্গা বসবাস করছে।



