শরিয়াভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানতে বড় পতন
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের ব্যাংক খাতে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শরিয়াভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকগুলোর অবস্থান ক্রমেই চাপে পড়ছে। আমানত, রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ এবং আমদানি-রপ্তানিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর গতি প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় দুর্বল। সর্বশেষ জুন মাসে ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত ও রেমিট্যান্সে পতন হয়েছে। এক মাসের ব্যবধানে আমানত কমেছে আড়াই শতাংশেরও বেশি। আর রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
দেশে বর্তমানে ৬১টি তফসিলি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক ১০টি। আর ১৭টি ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং শাখা রয়েছে। এর বাইরে শুধু ইসলামিক ‘উইন্ডো’ রয়েছে প্রচলিত ধারার ২১টি ব্যাংকের। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল শক্তি ছিল গ্রাহকের আস্থা ও শরিয়াহভিত্তিক পরিচালনার স্বচ্ছতা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণ বিতরণে অনিয়ম, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং কিছু প্রতিষ্ঠানে করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি এই ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের অস্থিতিশীলতা, তারল্য সংকট, দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ এবং ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের মতো ঘটনাগুলো আমানতকারীদের আচরণে প্রভাব ফেলেছে। ফলে আমানতকারী ও গ্রাহকদের একটি অংশ ধীরে ধীরে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে ঝুঁকছে। এতে সার্বিক ব্যাংক খাতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ কমে যাচ্ছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতের নভেম্বর ২০২৩ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ সময় ব্যাংক খাতে মোট আমানত ১৭ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই আমানতের ৭৯ দশমিক ১৩ শতাংশই ছিল প্রচলিত ব্যাংকগুলোর দখলে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ মাত্র ২০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মে মাসের তুলনায় জুনে ইসলামী ব্যাংকের আমানত কমেছে ২ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
মে মাসে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা থাকা আমানত জুনে নেমে এসেছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকায়। বিপরীতে একই সময়ে প্রচলিত ব্যাংকের আমানত ১৭ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৭ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসেই বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। বছরভিত্তিক হিসাবেও পিছিয়ে রয়েছে ইসলামী ব্যাংকগুলো। জুন ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬-এ প্রচলিত ব্যাংকের আমানত বেড়েছে ১২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংকগুলোর বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ আমানত সংগ্রহে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
এদিকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ইসলামী ব্যাংকগুলো প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। নভেম্বর ২০২৩ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট বিনিয়োগ ১৮ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৫ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। জুনে মোট বিনিয়োগের ৭৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ এসেছে প্রচলিত ব্যাংক থেকে; ইসলামী ব্যাংকের অংশ ২৪ দশমিক ১১ শতাংশ। এদিকে গত জুনে প্রচলিত ব্যাংকের বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এক মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ২০ শতাংশ।
বছরভিত্তিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ জুনে বেড়ে হয়েছে ৬ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। মাসভিত্তিক প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ দশমিক ০৬ শতাংশ। আর এক বছরে বেড়েছে ৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ বিনিয়োগে ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর সঙ্গে অর্থায়নের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের বড় অংশ কয়েকটি পদ্ধতির ওপর কেন্দ্রীভূত। বাই-মুরাবাহা ৪১ দশমিক ৫৭ শতাংশ, এইচপিএসএম ১৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং বাই-মুয়াজ্জাল ১৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ফলে অর্থায়ন পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে সম্পদের ক্ষেত্রেও ইসলামী ব্যাংকিংয়ের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট। নভেম্বর ২০২৩ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতের মোট সম্পদ ৪৬ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫৯ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত জুন শেষে প্রচলিত ব্যাংকের সম্পদ বেড়ে হয়েছে ৪৯ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এক বছরে এর প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংকগুলোর সম্পদ জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছরের জুনে ছিল ৯ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। ফলে এক বছরে সম্পদ বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৪২ শতাংশ।
অর্থাৎ এক বছরের হিসাবে ইসলামী ব্যাংকের সম্পদ বৃদ্ধির গতি প্রায় স্থবির। এটি ব্যাংকগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণের সক্ষমতা, নতুন অর্থায়ন এবং সামগ্রিক কার্যক্রমের গতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। ফলে ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক সূচকগুলোর একটি হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। গত জুন মাসে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ৪৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
মে মাসে এর পরিমাণ ছিল ৬৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে রেমিট্যান্স কমেছে ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ। বছরভিত্তিক তুলনাও আরও নেতিবাচক। গত বছরের জুন মাসে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছিল ৬১২ মিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে বার্ষিক পতন ২৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
অন্যদিকে প্রচলিত ব্যাংকের ক্ষেত্রে মে মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৩৭ কোটি ১০ লাখ ডলার, যা আগের মাসের তুলনায় ১৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ কম। তবে গত বছরের জুনের তুলনায় চলতি বছরের জুনে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। মূলত ঈদুল আজহা উপলক্ষে মে মাসে দেশে অস্বাভাবিক রেমিট্যান্স এসেছিল। তবে ঈদের পরের মাস জুনে রেমিট্যান্স কমে গিয়েছিল। তবে এই কমার হার ইসলামী ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে অনেক বেশি ছিল।
এছাড়া আমদানি দায় পরিশোধের ক্ষেত্রেও ইসলামী ব্যাংকের অংশ তুলনামূলক কম। জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমদানি পরিশোধ হয়েছে ৬৮০ কোটি ১০ লাখ ডলার। এর মধ্যে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে পরিশোধ হয়েছে ৫৮১ কোটি ডলার, যা মে মাসের তুলনায় ২১ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি। বছরভিত্তিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৯ দশমিক ০৪ শতাংশ।
অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে জুনে আমদানি পরিশোধ হয়েছে ৯৯ কোটি ১০ লাখ ডলার, যা মে মাসের তুলনায় ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। আর আমদানি পরিশোধে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ২৯ শতাংশ। রপ্তানি আয় গ্রহণেও ইসলামী ব্যাংকের বাজার অংশ সীমিত। এ সময় প্রচলিত ব্যাংকগুলো মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮১ দশমিক ৩৯ শতাংশ পরিচালনা করেছে। ইসলামী ব্যাংকের অংশ ছিল ১৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।



