ক্রেতা সংকটে পুঁজিবাজার নিঃস্ব হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় দরপতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। তবে বছরের পর বছর চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার শিকার পুঁজিবাজারে হঠাৎ আস্থা ও প্রত্যাশার ঝলকানি দিয়ে আবার যেন তা হাওয়ায়ই মিলে গেল। দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত পুঁজিবাজার নানামুখী বিতর্কের কারণে দীর্ঘ মন্দার মধ্য দিয়ে পার করে এলেও বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তবে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির সাথে মিল খুঁজে পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। ফলে এতে নতুন করে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া বিএনপি সরকার গঠন করার আগে পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা ফেরানো ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন অর্থমন্ত্রী বাজার পুনরুজ্জীবনে একাধিক ইতিবাচক আশ্বাস দেন। এরই ধারাবাহিকতায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করা হয় এবং নতুন বাজেটেও পুঁজিবাজারের গতি ফেরাতে বেশ কিছু ব্যবসাবান্ধব ও ইতিবাচক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এত সব আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ ও সংস্কার সত্ত্বেও টানা পতনের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না পুঁজিবাজার। ক্রমাগত এই দরপতনে প্রতিদিন বাজার মূলধন কমছে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সঞ্চিত মূলধন হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। নীতিগত সহায়তার পরও বাজারের এই লাগাতার মন্দাভাব বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে নামিয়ে এনেছে।
তেমনি গত এক সপ্তাহের বেশি ধরে টানা দরপতনে নতুন করে ২০ শতাংশের বেশি মূলধন হারিয়েছে বিনিয়োগকারীরা। ফলে পুঁজিবাজারে যেন কাটছেই না পতনের ধারা। টানা পাঁচ কার্যদিবস ধরে কমছে সূচক। ৫ কার্যদিবসে ডিএসইর সূচক উধাও ১৩০ পয়েন্ট। এর ফলে প্রতিদিনই লেনদেনে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমছে। তেমনি সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসেও সূচকের সাথে কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর। তবে টাকার পরিমানে লেনদেন কিছুটা বেড়েছে। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে দিনের লেনদেন শেষে পতন হলেও ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয় বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার মাধ্যমে। ফলে লেনদেনের শুরুতে সূচকের ঊর্ধ্বমুখিতার দেখা মেলে। এতে পতন কেটে ঊর্ধমুখী ধারায় ফেরার আশা করতে থাকেন বিনিয়োগকারীরা।
কিন্তু বিনিয়োগকারীদের সেই আশা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। দুপুর ১২টার পর থেকে বাজারে ঢালাও দরপতন শুরু হয়। শুরুতে বীমা খাতের কোম্পানি দিয়ে দরপতন শুরু হয়। এরপর তার প্রভাব পড়ে অন্যান্য খাতেও। যা অব্যাহত থাকে লেনদেনের শেষ পর্যন্ত। এতে দাম কমার তালিকা বড় হওয়ার পাশাপাশি মূল্যসূচকের বড় পতন দিয়ে দিনের লেনদেন শেষ হয়।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারে টানা দরপতনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাজার তদারকিতে ব্যর্থতার চিত্রই তুলে ধরছে। নতুন কমিশনকে নিয়ে বিনিয়োগকারীদের যে আশা ছিল, তা ধীরে ধীরে হতাশায় পরিণত হচ্ছে। তাঁদের কাছে এখন মনে হচ্ছে, নতুন কমিশন বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর বাজার যেভাবে ঊর্ধ্বমুখী ছিল, সেই গতি অব্যাহত থাকলে এতদিনে বাজারের অবস্থা অনেক ভালো থাকতো। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই ইতিবাচক ধারায় ভাটা পড়েছে।
পুঁজিবাজারের এমন পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। এভাবে পতন চলতে থাকলে আবারও বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা তৈরি হবে। তাই পরিস্থিতির উন্নতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে এবং ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে হবে। আর যদি তা করতে না পারে, তাহলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত দায়িত্ব থেকে সরে আসা।
জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ৪০ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৭৭৩ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৭ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ১৫০ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ১১ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ২ হাজার ১৬৪ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯০ কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৭৭ টির, দর কমেছে ২৬৬ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৪৭ টির। ডিএসইতে ৯৯৮ কোটি ১০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা বেশি। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৯৯৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকার।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৩২ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৪৯১ পয়েন্টে। সিএসইতে ২৩৫ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৬৯ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১৩৯ টির এবং ২৭ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ৭৩ কোটি ২২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।



