দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ব্যাংকে টাকার পাহাড় জমলেও সেই অর্থের জন্য অর্থনীতিতে তৈরি হচ্ছে না পর্যাপ্ত চাহিদা। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদহার, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং খেলাপি ঋণের চাপ সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতে নতুন ঋণের চাহিদা কমে গেছে। ফলে আমানত বাড়লেও ঋণ বাড়ছে না। ব্যাংকের হাতে জমছে বিপুল উদ্বৃত্ত তারল্য। গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে এ তারল্য প্রথমবারের মতো ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এক মাসেই বেড়েছে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। ফলে ব্যাংকের হাতে অর্থ থাকলেও তা শিল্প, ব্যবসা ও নতুন বিনিয়োগে কাক্সিক্ষত হারে যাচ্ছে না। বরং তুলনামূলক ভালো ব্যাংকগুলো বাড়তি অর্থ ঝুঁকিমুক্ত সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করছে কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সুবিধায় রাখছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, অতিরিক্ত তারল্যের একটি বড় অংশ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ হয়েছে।

অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় নতুন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না অনেক উদ্যোক্তা। এর সঙ্গে উচ্চ সুদ, ব্যবসার বাড়তি খরচ ও নীতিগত অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়েছে। ফলে ব্যাংকের বাড়তি অর্থ নিরাপদ খাতে চলে যাচ্ছে। এতে একদিকে ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনা সহজ হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে অর্থের প্রবাহ কমে যাচ্ছে। তাদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘায়িত হলে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক সংকেত। মূলত সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ব্যাপক ঋণ নেওয়ায় ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ তৈরি হয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতের পাওয়ার কথা ছিল এমন অর্থের বড় অংশ সরকারি খাতে চলে গেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বেশি থাকায় ঋণের খরচ বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। অনেক ব্যাংক মূলধন সংকটে থাকায় আগের মতো ঋণ বিতরণ করতে পারছে না। তার মতে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগে গতি না ফিরলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে না। ফলে অর্থনীতিতে স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

এক মাসেই উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়ল ৭১ হাজার কোটি : বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল প্রায় ৩ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া গত ডিসেম্বর শেষে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালের জুন শেষে ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে প্রায় সোয়া ১ লাখ কোটি টাকা। তবে উদ্বৃত্ত তারল্য মানেই ব্যাংকের ভল্টে একই পরিমাণ নগদ অর্থ পড়ে আছে এমন নয়।

নিয়মানুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোকে নগদ জমার হার (সিআরআর) এবং সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ (এসএলআর) নামে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। এ দুই উপায়ে রাখা অর্থ ব্যাংকের তরল সম্পদ হিসেবে গণ্য। বর্তমানে ব্যাংকগুলোকে মোট আমানতের ৪ শতাংশ সিআরআর এবং ১৩ শতাংশ এসএলআর আকারে জমা রাখতে হয়। এর অতিরিক্ত অর্থই উদ্বৃত্ত তারল্যের অংশ। এই অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা থাকে, যা প্রয়োজন হলে নগদায়ন করা সম্ভব।

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের বড় অংশ কয়েকটি ব্যাংকের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে পুরো খাতের তারল্য পরিস্থিতি এর মাধ্যমে বোঝা যায় না; অনেক ব্যাংক এখনও তারল্য সংকটে রয়েছে এবং বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা নেই। তিনি বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার জন্য শুধু ব্যাংকের ঋণ বিতরণে সতর্কতা দায়ী নয়, ব্যবসায়িক পরিবেশও বড় বাধা।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংকের অর্থের স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। সরকারের ঋণের বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করা গেলে ব্যাংকের অর্থ বেসরকারি খাতে আরও বেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।