পুঁজিবাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের স্বস্তি যেমন তেমনি রয়েছে হতাশাও
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বিগত আওয়ামী সরকারের লম্বা সময় ধরে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে ভুগতে থাকা দেশের পুঁজিবাজার শুরু থেকেই বড় ধরনের প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করছিল বিএনপি সরকারের আমলে পুঁজিবাজারের পূর্ণ সংস্কার ও বাজারকে বিনিয়োগবান্ধব করে গড়ে তোলা হবে। সরকার গঠনের পর বিগত ১৮০ দিনে পুঁজিবাজারে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ প্রত্যাশার প্রাপ্তি যেমন রয়েছে, তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কাজ করছে হতাশাও।
১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করা হলেও সংসদে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আইন সংশোধন ও অন্যান্য কিছু কারণে বেশ কিছু সময় ব্যয় হয়। প্রায় সাড়ে তিন মাস পর গত ৪ জুন নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান ও তার কমিশন দায়িত্ব নেন।
এর পরই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্রিয়াশীল কমিশনের বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রম ও ওই কমিশনের দ্বারা সংশোধিত বিভিন্ন বিধিবিধানকে আরো সহজ ও বিনিয়োগবান্ধব করার উদ্যোগ নেয় নতুন কমিশন। বড় মাপে তিনটি বিধিমালা যার মধ্যে ছিল আইপিও রুলস, মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ও মার্জিন রুলস। বিধিমালা তিনটির সংশোধনের কাজ চলতে থাকে, যার সবগুলোই ছিল বেশ স্পর্শকাতর।
ফলে জনমত যাচাই ও বিধিসংক্রান্ত নানা জটিলতায় এতে বেশ বেশ কিছু সময় পার হয়ে যায়। সম্প্রতি মার্জিন রুলস নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হলেও মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ও আইপিও রুলস এখনো প্রকৃত আলোর মুখ দেখেনি। ফলে নতুন তালিকাভুক্তি যেমন থেমে আছে, তেমনি মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা নিয়েও বেশ কিছু ধোঁয়াশা রয়েছে। এর ফলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের তৈরি হয়েছে চরম আস্থাহীনতা। লেনদেনে দেখা দিয়েছে খরা। দীর্ঘদিন ধরেই মন্দার মধ্যে পুঁজিবাজার। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে আসেনি কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও)। সার্বিকভাবে দেশের পুঁজিবাজার এখন কার্যত গতিহীন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা এহেন বাজার আচরণের কারণ হিসাবে শিল্প ও সেবা খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের অপ্রতুল সরবরাহকেই দায়ী করছেন। যেহেতু পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির একটি বড় অংশই উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের স্বল্পতা উৎপাদনে ব্যত্যয় ঘটায়। এর ফলে বাজারে নেতিবাচক বার্তা যায়, যা বাজারকে একপ্রকার গতিহীন করে তোলে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হলে পুঁজিবাজার আবার তার স্বাভাবিক আচরণ ফিরে পাবে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, নতুন সরকারের বেশ কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারকে বর্তমান অবস্থায় নিয়ে এসেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধসহ বৈশ্বিক কিছু সঙ্কটের কারণে দেশের অর্থনীতি এখন অনেকটা স্থবির। তবে আমাদের বিনিয়োগকারীরা দৃশ্যমান কিছু অগ্রগতি দেখতে চান। এরই মধ্যে যদি আইপিও বা ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে হলেও কিছু ভালো কোম্পানি বাজারে আনা যেত তাহলে এ মুহূর্তে পুঁজিবাজারে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা হয়তো হতো না। বাজার একটি সাবলীল গতিতে থাকত, যেমন ছিল জুলাই মাসে। তবে তিনি মনে করেন, চলমান যেসব সঙ্কট রয়েছে, তা কাটানো গেলে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে পুঁজিবাজার।
ঢাকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম মনে করেন, পুঁজিবাজার যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, তা থেকে উত্তরণের জন্য ছয় মাস যথেষ্ট সময় নয়। তা ছাড়া বিএসইসি পুনর্গঠনের পর খুব বেশি সময় পার হয়নি। এরই মধ্যে তারা বেশ কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। মার্জিন রুলস সংশোধন করা হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালাও শেষ পর্যায়ে। এখন আইপিও রুলসটা শেষ করা গেলে নতুন নতুন কোম্পানি বাজারে আসবে বলে আশা করেন তিনি।
জানা গেছে, সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের মিশ্রাবস্থায় লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন কমেছে টাকার পরিমানে লেনদেন। তবে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর বেড়েছে। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ১৬ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৭৮৬ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৪ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১ হাজার ১৫৬ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক .৪৫ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ২ হাজার ১৬২ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯০ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১৯২ টির, দর কমেছে ১২৭ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৭১ টির। ডিএসইতে ৬৭১ কোটি ৯৮ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৬০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৭৩২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৭ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৪৮৬ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৯৬ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৭৬ টির দর বেড়েছে, কমেছে ৮৭ টির এবং ৩৩ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।



