ডিএসইর গণছাঁটাই ইস্যুতে এফআইডির হস্তক্ষেপ
শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধারাবাহিক চাকরি অবসানের ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি)। চাকরিচ্যুত চার কর্মকর্তার অভিযোগ তদন্ত করে তাদের পুনর্বহালের বিষয়ে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) নির্দেশ দিয়েছে বিভাগটি।
গত মঙ্গলবার এফআইডির উপসচিব ফারজানা জাহানের সই করা এক চিঠিতে বিএসইসি চেয়ারম্যানকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিএসইর চার কর্মকর্তা গত ২৬ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে তাদের বেআইনি ও একতরফাভাবে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ করেছেন।
আবেদনটি পর্যালোচনা করে তাদের চাকরিতে পুনর্বহালের বিষয়ে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বিএসইসিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চাকরিচ্যুত এই চার কর্মকর্তা হলেন ডিএসইর সাবেক তিন উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. আব্দুর রাজ্জাক, মো. শাহীন সরওয়ার হোসেন ও হোসনে আরা পারভীন এবং সাবেক সিনিয়র ম্যানেজার মমতাজুল হক চৌধুরী। তাদের অভিযোগ, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে একই ধরনের অভিযোগে ডিএসইর সাবেক ডিজিএম মো. আব্দুল লতিফও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আবেদন করেন। গত ৫ জুলাই করা ওই আবেদনে তিনি অভিযোগ করেন, কোনো পূর্ব নোটিশ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে শুধু পদের প্রয়োজনীয়তা নেই কারণ দেখিয়ে তাকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আব্দুল লতিফের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ জুলাই এফআইডি থেকে বিএসইসি চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। এতে আবেদনটির বিষয়ে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এ বিষয়ে বিএসইসি তদন্ত করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে, গত দুই মাসে ডিএসইতে একের পর এক কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি অবসানের ঘটনায় নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ গত ১১ আগস্ট এক দিনেই আরও ১১ জনের চাকরি অবসান করা হয়। এর আগে ২৫ জুন চার ডিজিএমসহ আট কর্মকর্তার এবং ২৯ জুলাই আরও নয়জনের চাকরি অবসান করা হয়। তিন দফায় অন্তত ২৮ কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন।
প্রথম দুই দফায় মোট ১৭ জনের চাকরি অবসানের বিষয়ে গত ৪ আগস্ট ডিএসই কর্তৃপক্ষ ব্যাখ্যা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, সাংগঠনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ শ্রম আইন ও প্রতিষ্ঠানের সার্ভিস রুল অনুসরণ করেই এসব কর্মকর্তার চাকরি অবসান করা হয়েছে। ব্যক্তিগত বিবেচনা বা বৈষম্যের ভিত্তিতে নয়, প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন, কার্যকারিতা ও ব্যবসায়িক স্বার্থ বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা ডিএসইর এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেছেন। তারা চাকরিতে পুনর্বহাল এবং পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। গত ৪ আগস্ট তারা ডিএসইর ব্যাখ্যাকে বিভ্রান্তিকর বলেও দাবি করেন।
ডিএসইর চাকরিচ্যুতির বিষয়ে এর আগে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেছিলেন, ডিএসইর নিয়োগ বা ছাঁটাই তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ডিমিউচুয়ালাইজেশনের মাধ্যমে এ বিষয়ে ডিএসইর বোর্ডকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা বা স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগে অনিয়ম হলে বিএসইসি তা খতিয়ে দেখবে।
অন্যদিকে, চাকরিচ্যুতির অভিযোগের পাশাপাশি ডিএসইর শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ, আর্থিক লেনদেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগও খতিয়ে দেখছে বিএসইসি। এসব অভিযোগ অনুসন্ধানে কমিশন তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করেছে।
সম্প্রতি অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ডিএসইর কাছে শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ সংক্রান্ত নথি, আর্থিক বিবরণী, পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণী এবং কর্মকর্তাদের পুঁজিবাজারে লেনদেন ও বিও হিসাবসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য চেয়েছে বিএসইসি। ফলে ডিএসইতে ধারাবাহিক চাকরি অবসানের বিষয়টি এখন আর শুধু প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নজরদারিতেও এসেছে। তবে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের অভিযোগ এবং ডিএসইর ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।এফআইডির নির্দেশনার পর বিএসইসির তদন্ত ও বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।



