পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি ১৫-২০টা: মাসুদ খান
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি ভালো কোম্পানি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেন, আজ আমাদের শেয়ার মার্কেটের দিকে তাকাই, আপনি স্ট্রাগল করবেন যে ১৫টা কী ২০টা কোম্পানি আসলে ভালো কোম্পানি। বাকিগুলোকে ভালো বলবো না, খারাপ বলবো না। তবে সেখানে আয়ের ওঠানামা অনেক বেশি।
গত শুক্রবার ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) সদস্যদের আবাসিক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিএমজেএফ সভাপতি মনির হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব রাসেল।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, কোনো কোম্পানির আয়ের ওঠানামা যত বেশি হয়, তার আর্থিক ঝুঁকিও তত বেশি। তাই বাজারকে আরও শক্তিশালী করতে দ্রুত ভালো ও স্থিতিশীল কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে থাকা অনেক কোম্পানির পাশাপাশি নতুন কিছু কোম্পানি যুক্ত হলেও সেগুলো নিয়ে নানান ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এছাড়া দীর্ঘ সময় প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও কার্যক্রম প্রায় বন্ধ থাকায় বাজারে ভালো কোম্পানির সরবরাহ বাড়েনি।
পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বোঝাতে ইংরেজি কবিতার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘দ্য রাইম অব দ্য অ্যানসিয়েন্ট মেরিনার’ এর মতো অবস্থা ‘পানি সব জায়গায় আছে, কিন্তু একবিন্দু পানি পান করার নেই।’ মাসুদ খান বলেন, বাজারে কোম্পানি আছে, কিন্তু বিনিয়োগকারীদের সামনে মানসম্পন্ন ও স্থিতিশীল কোম্পানির সংখ্যা খুবই সীমিত।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা দ্রুত বাড়াতে সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডিরেক্ট লিস্টিং) উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইপিও প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় ভালো কোম্পানিগুলোকে দ্রুত পুঁজিবাজারে আনার জন্য সরাসরি তালিকাভুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি জানান, গত সোমবার ডিরেক্ট লিস্টিং বিধিমালা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আইপিও প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনা হবে। আইপিও প্রক্রিয়া দ্রুত করতে ‘এক্সটেন্ডেড অডিট’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে স্ট্যাটুটরি অডিটে মূলত কোম্পানির আর্থিক বিবরণী সত্য ও ন্যায্যভাবে উপস্থাপিত হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়। কিন্তু পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোম্পানির জমি, যন্ত্রপাতি, মজুত পণ্য, পাওনা, সরবরাহকারীসহ বিভিন্ন সম্পদ ও তথ্য বাস্তবে আছে কি না, সেগুলোও যাচাই করা প্রয়োজন।
এ জন্য আইপিও আবেদনকারী কোম্পানির বর্ধিত অডিট করা হবে। এতে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় ডিএসইর পক্ষ থেকে আর্থিক বিবরণী নিয়ে বারবার প্রশ্ন করার প্রয়োজন কমবে এবং আইপিও প্রক্রিয়া দ্রুত হবে বলে জানান তিনি। ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আনতে হাইব্রিড ব্যবস্থা চালুর কথাও জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। এ ব্যবস্থায় কোনো কোম্পানি একই সঙ্গে কিছু মূলধন সংগ্রহ এবং সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে। বিশেষ করে দেশের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে এই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, বহুজাতিক ও বড় স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে স্বপ্রণোদিতভাবে পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত করা হবে। প্রয়োজনে আইনের ক্ষমতাও ব্যবহার করা হবে। মাসুদ খান আরও বলেন, সিকিউরিটিজ আইনের ২০এ ধারার আওতায় জনস্বার্থে কোনো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি’র সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হবে। এ সময় তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে দেশের বড় ও ফ্ল্যাগশিপ কোম্পানিগুলোর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পুঁজিবাজারে আসবে।
বিএসইসির চেয়ারম্যান জানান, বড় স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত করতে তালিকাভুক্তির বিভিন্ন সুবিধা তুলে ধরছে বিএসইসি। তিনি বলেন, কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে এর করপোরেট ইমেজ বাড়ে এবং বাজারে কোম্পানিটির একটি মূল্য বা ভ্যালু তৈরি হয়। এছাড়া কোম্পানির
পুঁজিবাজারে লেনদেনযোগ্য হওয়ায় মালিকানা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগও সহজ হয়। বিশেষ করে পারিবারিক ব্যবসায় উত্তরাধিকার নিয়ে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তালিকাভুক্তির মাধ্যমে সেটি কমানো সম্ভব বলে মনে করেন মাসুদ খান।
তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের একটি বাজারমূল্য তৈরি হয়। ফলে কোনো শেয়ারহোল্ডার ব্যবসা থেকে বের হতে চাইলে তার জন্য একটি কার্যকর বাজার থাকে। পুঁজিবাজারে আসার ক্ষেত্রে কর সুবিধার বিষয়টিও তুলে ধরেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির করহারে আরও যৌক্তিক পার্থক্য তৈরির বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পুঁজিবাজারের দৈনন্দিন সূচক ওঠানামা নিয়ে স্বল্পমেয়াদি চিন্তা না করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, আমি তো ইনডেক্সকে ওঠানামা করাতে পারবো না। বাজারে উত্থান হবে, পতন হবে এটাই স্বাভাবিক ধারা। জোয়ার-ভাটা হবে, এটাই স্বাভাবিক ধারা। এটাকে আমি আটকাতে পারবো না।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ সূচক বাড়ানো বা কমানো নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল, ন্যায্য ও স্বচ্ছ পুঁজিবাজার গড়ে তোলা। আমাকে একটা অর্ডারলি মার্কেট আনতে হবে, আমাকে একটা ফেয়ার মার্কেট আনতে হবে, আমাকে একটা ট্রান্সপারেন্ট মার্কেট আনতে হবে। এটা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
এসময় আশাবাদ ব্যক্ত করে মাসুদ খান বলেন, আগামী এক বছরে দেশের পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে এবং বাজারে আরও অনেক ভালো কোম্পানি আসবে। এতে বর্তমান দুর্বলতাগুলোও ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।



