শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: টানা দরপতনে ন্যুব্জ দেশের পুঁজিবাজার। ফলে দিন যতই যাচ্ছে পুঁজিবাজারের হাহাকার ততই বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ মানেই লোকসান। যার ফলে পুঁজিবাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা বিরাজ করছে। ‘অদ্ভুত’ এমন পুঁজিবাজার ৩০ বছরের ইতিহাসে দেখা যায়নি বলে বিনিয়োগকারীদের আর্তনাদ বেড়েছে। তাছাড়া মাসুদ কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার ৪ মাস অতিবাহিত হলেও এখন আস্থা ফেরাতে পারেনি পুঁজিবাজার। বরং আস্থা বিনিয়োগকারীদের যেটুকু ছিল তাও সংকটে পড়েছে। ফলে দিন দিন বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে।

এদিকে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচকের বড় দরপতন হয়েছে। এক কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান সূচক কমেছে ১০৪ পয়েন্ট। এতে এক কার্যদিবসে বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ৬ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা। একই সঙ্গে লেনদেনও কমে নেমে এসেছে ৫০০ কোটি টাকার ঘরে। মুলত গত এক মাসের ব্যবধানে ডিএসইতে ৪০৩ পয়েন্ট সূচকের দরপতন হয়েছে।

আগস্ট মাস শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স প্রায় ৩০০ পয়েন্ট কমেছে। একই সময়ে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত সব সিকিউরিটিজের বাজার মূলধন কমেছে ১০ হাজার ৩৯৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। শুধু সূচক ও বাজার মূলধন কমেনি, আগস্টে লেনদেনের পরিমাণেও বড় ধরনের সংকোচন দেখা গেছে। মাসের শুরুতে যেখানে এক দিনে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছিল, সেখানে মাসের শেষ কার্যদিবসে তা নেমে আসে ৪৭৭ কোটি ২৫ লাখ টাকায়।

তবে সেপ্টেম্বর মাসের চার কার্যদিবসে মধ্যে তিন কার্যদিবস সূচক নামমাত্রা বাড়লেও সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে সূচকের বড় দরপতন হয়েছে। এর ফলে এক কার্যদিবসে বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ৬ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা। মুলত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের চার কার্যদিবস মিলে বাজার মূলধন উধাও প্রায় ১৭ হাজার ১৭৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শুরুতে সব সিকিউরিটিজের বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার ১৩৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ৩১ আগস্ট মাসের শেষ কার্যদিবসে লেনদেন শেষে তা কমে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৭৩৯ কোটি ২৬ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক মাসে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ১০ হাজার ৩৯৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। তালিকাভুক্ত শেয়ার ও অন্যান্য সিকিউরিটিজের বাজারদর কমে যাওয়ার কারণেই সম্মিলিত বাজারমূল্যে এই পতন হয়েছে। এর ফলে সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওর বাজারমূল্যের ওপর।

এটি বর্তমান চেয়ারম্যান মাসুদ কমিশনের আমলে সূচকের সর্বনিম্ন অবস্থান। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়ে গেছে এবং বাজারে ক্রেতার অভাব দেখা দিয়েছে। কিছু কিছু কোম্পানির শেয়ার বড় বিনিয়োগকারীরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে সেল প্রেসার দিয়ে নিচে নামিয়ে ফেলছেন বলে বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করেছেন।

এর পর ২০২৬ সালের জুন মাসে মাসুুদ খানের নেতৃত্বে গঠিত বিএসইসির নতুন কমিশন ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার ও কৃত্রিম হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালুর মতো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিলেও দীর্ঘদিনের অনাস্থা ও বাজার মন্দা পুরোপুরি কাটিয়ে আস্থার সংকট এখনও কাটেনি।

এদিকে গত জুন মাসে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন মাসুদ খান। দায়িত্ব গ্রহনের পর বিনিয়োগকারীদের আশার আলো দেখালেও বাস্তবে গত ৪ মাসে বিনিয়োগকারীরা নি:স্ব হয়েছেন। এখন বিনিয়োগকারীদের একটাই আর্তনাদ আমাদের বাঁচান, আমাদের পুঁজি শেষ। আর দৈনিক লেনদেনের ধীর গতিতে সন্তুষ্ট হতে পারছে না বিনিয়োগকারীরা। তেমনি বিএসইসি চেয়ারম্যানের হুটহাট বক্তব্যে বিনিয়োগকারীদের মনে তৈরি করেছে আস্থার সংকট। এছাড়া বিএসইসি এখন পর্যন্ত এমন কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি যে সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে। অন্যদিকে কোন বিনিয়োগকারী বেশি পরিমাণ শেয়ার কিনলেই বিএসইসি থেকে ফোন দিয়ে কারণ জানতে চাওয়া হয়।

এদিকে পুঁজিবাজারে অংশীজন থেকে শুরু করে বিনিয়োগকারী পর্যন্ত সবাই বলছেন, কেউ ভালো নেই। কারণ শেয়ারের অব্যাহত দরপতনে সবাই বড় অঙ্কের পুঁজি হারিয়েছেন। সরকার বদলের পর পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নেতৃত্বের বদল হলেও বাজারে কোনো আশার আলো দেখা যায়নি। বিদ্যমান সংকটেরও সমাধান হচ্ছে না। যে কারণে দরপতনের একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে পুঁজিবাজার। এতে হতাশা বাড়ছে সর্বমহলে।

অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীদের মতে, পুঁজিবাজারে উত্থান-পতন হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক দিন ধরে পুঁজিবাজারে টানা পতন হচ্ছে। সূচক ক্রমেই নিম্নগামী হচ্ছে। ফলে পুঁজিবাজার নিয়ে উদ্বেগ ও আশঙ্কা বাড়ছে। এছাড়া টানা দরপতন অব্যাহত থাকায় পুঁজিবাজার নিয়ে উদ্বিগ্ন রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে প্রতিদিনই পোর্টফোলিও থেকে পুঁজি উধাও হয়ে যাচ্ছে। লাভের হিসাব বাদ দিয়ে প্রতিদিন কত লোকসান হচ্ছে, সেই হিসাব কষতে হচ্ছে ছোট-বড় সব ধরনের বিনিয়োগকারীর। ভালো শেয়ারে বিনিয়োগ করেও আসছে না কাঙ্খিত ফল। ফলে বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ।

অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী শাহজাহান মিয়া বলেন, পুঁজিবাজারের বর্তমান মুল সমস্যা আস্থা সংকট। আস্থা সংকটের কারনে বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না। আস্থা সংকট না কাটলে বিনিয়োগকারীদের বাজারমুখী করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবো। কারণ টানা দরপতনের কারনে অধিকাংশ বিনিয়োগকারী বাজারবিমুখ হয়ে পড়ছেন। ফলে এমন বাজারের চিত্র ৩০ বছরের ইতিহাসেও দেখিনি।

স্টক অ্যান্ড বন্ডের বিনিয়োগকারীরা মানিক মিয়া আহাজারী করে বলেন, ‘অদ্ভুত’ এমন পুঁজিবাজার ৩০ বছরের মধ্যে দেখিনি। টানা দরপতনে আমাদের পুঁজি শেষ হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোন ভুমিকা নিচ্ছে না। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বক্তৃতায় বাজার সংস্কারের কথা। আসলে বাজার স্থিতিশীল না করে কী ভাবে সংস্কার করে পুঁজিবাজার এমন প্রশ্ন বিনিয়োগকারীদের।