রহিমা ফুডের শেয়ার কারসাজির নেপথ্যে দেলোয়ার ও সোলয়মান
বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের রহিমা ফুড করপোরেশন লিমিটেডের শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ও অনিয়মের তদন্তে নেমে বড় ধরনের জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। শেয়ারদরে কারসাজি ও আইন লঙ্ঘনের দায়ে একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং রহিমা ফুডের এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে মোট ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পৃথক দুই এনফোর্সমেন্ট আদেশের মাধ্যমে এই জরিমানা ধার্য করা হয়। অর্থ দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন: শেয়ার ব্যবসায়ী মো. দেলোয়ার হোসেন এবং রহিমা ফুড করপোরেশনের ভ্যাট ইনচার্জ মো. সোলয়মান। দুজনকেই আগামী ৩০ দিনের মধ্যে জরিমানার অর্থ বিএসইসির অনুকূলে ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করা হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এর একটি বিশেষ তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিএসইসি এ ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
তদন্ত দল জানায়, ২০২৫ সালের ১৫ জুন থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত রহিমা ফুডের শেয়ার লেনদেনে ব্যাপক অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। এই সময় মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ৬৮ দশমিক ৯০ টাকা থেকে ১০৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেড়ে ১৪১ দশমিক ২০ টাকা পৌঁছায়।
ডিএসইর তদন্তে উন্মোচিত হয় কীভাবে বিনিয়োগকারী মো. দেলোয়ার হোসেন নিজের একাধিক বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার) হিসাব ব্যবহার করে ‘ওয়াশ ট্রেড’ বা কৃত্রিম লেনদেন তৈরি করেছিলেন। তিনি এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজ এবং শেলটেক ব্রোকারেজে থাকা নিজের দুটি বিও হিসাবের মধ্যেই শেয়ার কেনাবেচা করেন। ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই তিনি এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে প্রতি শেয়ার ১৩৪ টাকা দরে ২ হাজার ৮৬টি শেয়ার লেনদেন করেন।
এর ফলে শেয়ারের প্রকৃত মালিকানায় (বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ) কোনো পরিবর্তন না আসলেও বাজারে কৃত্রিম চাহিদা ও দাম বাড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হয়, যা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর বিধি লঙ্ঘন। দেলোয়ার হোসেনের দাবি ছিল এটি একটি প্রযুক্তিগত ভুল, কিন্তু কমিশন তা প্রত্যাখ্যান করে ইচ্ছাকৃত বাজার কারসাজি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
অন্যদিকে, কোম্পানির গোপন তথ্যের সুবিধা নিয়ে স্বজনপ্রীতি ও অসদুপায় অবলম্বনের (ইনসাইডার ট্রেডিং) দায়ে দণ্ড পেয়েছেন রহিমা ফুডের কর্মকর্তা মো. সোলয়মান। তদন্তে দেখা যায়, বিএসইসির ‘সুবিধাভোগী ব্যবসা নিষিদ্ধকরণ বিধিমালা, ২০২২’ উপেক্ষা করে সোলয়মান ও তার স্ত্রী নাজমা বেগম কোম্পানির শেয়ার লেনদেনে অংশ নেন।
বিধি অনুযায়ী, কোম্পানির আর্থিক হিসাব বছর সমাপ্তির পর নিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত (১ মে ২০২৫ থেকে) কর্মকর্তাদের শেয়ার কেনাবেচায় আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকে। কিন্তু সোলয়মান দম্পতি ওই নিষিদ্ধ সময়ে নিজ কোম্পানির ১২ হাজার ৪০৯টি শেয়ার কেনেন এবং ১০ হাজার ২৫৪টি শেয়ার বিক্রি করে ২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা মুনাফা তুলে নেন।
শুনানিতে সোলয়মান আইনি নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞতার অজুহাত দেখালেও বিএসইসি তা সম্পূর্ণ নাকচ করে দেয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় এ ধরনের অনিয়ম কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।



